বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫

কুরআন শরীফে বর্ণিত মুনাফিকের পরিচয়

মুফতী হেদায়েতুল হক

মুনাফিকী (কপটতা) একটি মারাত্নক রোগ। আক্বীদা বা বিশ্বাসগত দিক থেকে মুনাফিকী কুফুরীর নিকৃষ্টতম প্রকার। যাদের ব্যপারে কোরআন বলে,
اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ فِی الدَّرْکِ الْاَسْفَلِ مِنَ النَّارِ ۚ وَلَنْ تَجِدَ لَهُمْ نَصِیْرًا
নিঃসন্দেহে মুনাফিকরা রয়েছে দোযখের সর্বনিম্ন স্তরে। আর তোমরা তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী কখনও পাবে না। সূরা নিসা : ১৪৫
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় এ ধরনের মুনাফিকদেরকে কখনো কখনো অহীর মাধ্যমে চি‎িহ্নত করা হয়েছে। ওহী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এ ধরনের মুনাফিক চিহ্নিত করার কোন উপায় নেই, বরং বাহ্যিকভাবে মানুষ এখন দুটি শ্রেণীতেই বিভক্ত- মুমিন ও কাফির।
হাদিস শরীফে আছে, হযরত হুযায়ফা রাযি. বলেন,
إنما كان النفاق على عهد النبي صلى الله عليه وسلم، فأما اليوم فإنما هو الكفر بعد الإيمان
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুনাফিকী ছিল কিন্তু আজকে ঈমানের পর কুফুরী ব্যতীত আর কোন স্তর নেই। সহীহ বুখারী : ৭১১৪
তার মানে এই না যে, বর্তমানে কোন মুনাফিক নেই। বর্তমানেও মুনাফিক আছে, কিন্তু দিলের প্রকৃত অবস্থা যেহেতু আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কেউ জানেনা তাই কাউকে নির্দিষ্ট করে বলা যাবেনা যে সে মুনাফিক। তবে আক্বীদাগত দিক থেকে বহু মুনাফিক মুমিনদের মাঝে লুকিয়ে আছে। এ ধরনের মুনাফিকদের আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত দিবসে মুমিনদের থেকে পৃথক করবেন।
হাদিস শরীফে বহু আমলকে মুনাফিকী আমল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো বর্তমানে আমাদের মুসলিম সমাজে খুব বেশী পাওয়া যায়। মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন, কোরআন-হাদিসে বর্ণিত মুনাফিকের আলামতসমূহ যাদের মাঝে পাওয়া যায় তারা হল আমলী মুনাফিক। সমাজের উচ্চশ্রেণী থেকে নিম্নশ্রেণী পর্যন্ত প্রায় অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত। মুনাফিকী কাজগুলো আমরা নির্দ্ধিধায় করে থাকি, অথচ এগুলো আমাদের ঈমানের জন্য কত মারাত্মক ক্ষতিকর সে খবর আমাদের নেই। হতে পারে এই আমলী নিফাক কোন একদিন ই’তিকাদ বা বিশ্বাসের মুনাফিকীতে রূপ নিবে, যা মারাত্মক কুফুরী। তাই চলুন আমরা জেনে নেই কোরআন হাদিসে কোন আমলগুলোকে মুনাফিকী আমল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারপর আমরা এ আমলগুলো বর্জনে সচেষ্ট হই। দুই একটি হাদিস এমনও রয়েছে যেগুলোতে মুনাফিকের কোন আলামত না থাকলেও মুনাফিক সংক্রান্ত বিধায় এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোরআনে কারীমে পূর্ণ একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে মুনাফিকদের সম্পর্কে। এ ছাড়াও অনেক আয়াতে তাদের আলোচনা রয়েছে।
কোরআনে বর্ণিত মুনাফিকের আলামত
এক. কোরআনের ভাষায় মুনাফিকী দিলের একটি মারাত্মক ব্যাধি। কোরআনের আয়াত শুনলে মুনাফিকদের দিলের এই ব্যাধি আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
وَ اَمَّا الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا اِلٰی رِجْسِهِمْ وَمَاتُوْا وَهُمْ کٰفِرُوْنَ
বস্তুত যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরো কলুষ বৃদ্ধি করে আর তারা কাফের অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করে। সুরা তাওবা : ১২৫
অর্থাৎ কোরআনের বিধান শুনলে তাদের ভাল লাগে না, বিরক্তি আসে। আসুন একটু ভেবে দেখি, কোরআনের বিধান শুনলে আমাদের বিরক্তি আসেনা তো?
দুই. তারা কাজ না করেই প্রশংসা কুড়াতে চায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِیْنَ یَفْرَحُوْنَ بِمَاۤ اَتَوْا وَّیُحِبُّوْنَ اَنْ یُّحْمَدُوْا بِمَا لَمْ یَفْعَلُوْا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَۃٍ مِّنَ الْعَذَابِ ۚ وَلَهُمْ عَذَابٌ اَلِیْمٌ
তুমি মনে করো না, যারা নিজেদের কৃতকর্মের ওপর আনন্দিত হয় এবং না করা বিষয়ের জন্য প্রশংসা কামনা করে, তারা আমার নিকট থেকে অব্যাহতি লাভ করেছে। বস্তুত তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। সূরা আলে ইমরান : ১৮৮
নিন্দা শুনতে প্রস্তুত এমন মানুষ পাওয়া তো আজ প্রায় দুঃসাধ্য। অথচ প্রশংসা শুনতে সবাই পাগল। কাজের সময় আমাদের দেখা যায় না কিন্তু বাহবা কুড়াতে আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি। বরং প্রশংসা পাওয়ার জন্য না করা, না দেখা কাজের ফিরিস্তি মানুষের সামনে তুলে ধরি। লক্ষণটি কিন্তু মুমিনের নয়, মুনাফিকের।
তিন. জিহাদের বিধান শুনলে তারা বেহুশের মত হয়ে যায়, মৃত্যুর বিভীষিকা তাদের উপর ছেয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
فَاِذَا جَآءَ الْخَوْفُ رَاَیْتَهُمْ یَنْظُرُوْنَ اِلَیْکَ تَدُوْرُ اَعْیُنُهُمْ کَالَّذِیْ یُغْشٰی عَلَیْهِ مِنَ الْمَوْتِ
যখন বিপদ নেমে আসে, তখন আপনি দেখবেন মৃত্যুর ভয়ে অচেতন ব্যক্তির মত তারা আপনার দিকে চোখ উল্টে তাকায়। সূরা আহযাব : ১৯
অন্য আয়াতে আছে,
وَ یَقُوْلُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَوْلَا نُزِّلَتْ سُوْرَۃٌ فَاِذَاۤ اُنْزِلَتْ سُوْرَۃٌ مُّحْکَمَۃٌ وَّ ذُکِرَ فِیْهَا الْقِتَالُ رَاَیْتَ الَّذِیْنَ فِیْ قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ یَّنْظُرُوْنَ اِلَیْکَ نَظَرَ الْمَغْشِیِّ عَلَیْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَاَوْلٰی لَهُمْ
যারা মুমিন তারা বলে, একটি সূরা নাযিল হয় না কেন? অতঃপর যখন কোন দ্ব্যর্থহীন সূরা নাযিল হয় এবং তাতে জেহাদের উল্লেখ করা হয়, তখন যাদের অন্তরে রোগ আছে, আপনি তাদেরকে মৃত্যুভয়ে মূর্ছাযাওয়া মানুষের মত আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবেন। সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্যে। সূরা মুহাম্মাদ : ২০
ইমামে ইনকিলাব হযরত মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী রহ. এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, যাদের অন্তরে মুনাফিকীর রোগ আছে সেই মুনাফিকরা যখন যুদ্ধের নির্দেশ শুনে তখন তাদের উপর মৃত্যুর মূর্ছা দশা ছেয়ে যায়। কেননা, তাদের কামনা হল, যুদ্ধ করা ব্যতীতই বিপ্লব সাধিত হোক আর তারা রাজত্ব করবে। কারণ যুদ্ধে রয়েছে জান-মাল হারানোর প্রবল আশঙ্কা। মাজমূআ তাফাসীরে ইমাম সিন্ধী
চার. তাদের নামায অলসতা আর লৌকিকতাপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
اِنَّ الْمُنٰفِقِیْنَ یُخٰدِعُوْنَ اللهَ وَهُوَ خَادِعُهُمْ وَ اِذَا قَامُوْۤا اِلَی الصَّلٰوۃِ قَامُوْا كُسَالٰی یُرَآءُوْنَ النَّاسَ وَلَا یَذْكُرُوْنَ اللهَ اِلَّا قَلِیْلًا مُّذَبْذَبِیْنَ بَیْنَ ذٰلِکَ لَاۤ اِلٰی هٰۤؤُلَآءِ وَلَاۤ اِلٰی هٰۤؤُلَآءِ وَمَنْ یُّضْلِلِ اللهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهٗ سَبِیْلًا
অবশ্যই মুনাফিকরা প্রতারণা করছে আল্লাহ্র সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুত তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায় একান্ত শিথিলভাবে, লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহ্কে অল্পই স্মরণ করে। এরা দোদুল্যমান অবস্থায় ঝুলন্ত; এদিকেও নয় ওদিকেও নয়। বস্তুত যাকে আল্লাহ্ গোমরাহ্ করে দেন, তুমি তাদের জন্য কোন পথই পাবে না কোথাও। সুরা নিসা : ১৪২, ১৪৩
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম নামায আদায় করতেন আর আমরাও নামায আদায় করি। কিন্তু আমাদের নামায কি তাঁদের নামাযের সাথে মিলে?
(ইনশাআল্লাহ আগামী সংখ্যায় থাকছে, হাদীসে বর্ণিত মুনাফিকের পরিচয়)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন