اِنَّ اَوَّلَ بَیْتٍ وُّضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِیْ بِبَکَّۃَ مُبٰرَكًا وَّهُدًی لِّلْعٰلَمِیْنَ
অনুবাদ: নিশ্চয় সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ঐটি যা মক্কা নগরীতে (অবস্থিত) যা বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াত। সূরা আলে ইমরান: ৯৬
তাফসীর:
কা’বা ঘরের মাহাত্ম্য ও তার নির্মাণ ইতিহাস
উপরোক্ত আয়াতে কা’বা ঘরের তিনটি মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। যথা:
এক. এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর (অর্থাৎ প্রকৃত উপাসনালয় সমূহের সর্বপ্রথম উপাসনালয়)।
দুই. এটি বরকতময় ঘর।
তিন. বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াত ও পথপ্রদর্শনের মাধ্যম।
কা’বা ঘর পৃথিবীর সর্বপ্রথম ঘর’ এর দুটি অর্থ হতে পারে। যথা:
এক. ঘর বলতে ধরাপৃষ্ঠে সর্বপ্রথমে এটিই নির্মিত হয়েছে। ইতিপূর্বে ইবাদতখানা বা উপাসনালয় হিসাবেও কোন ঘর নির্মিত হয় নাই মানুষের বাসস্থান হিসাবেও কোন ঘর নির্মিত হয় নাই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি., মুজাহিদ, কাতাদা প্রমুখ থেকে এরূপ বর্ণিত রয়েছে।
দুই. মানুষের বাসগৃহ ইতিপূর্বেও নির্মিত হয়েছে বটে কিন্তু ইবাদতখানা বা উপাসনালয়সমূহের মধ্যে এটিই সর্বপ্রথম নির্মিত হয়েছে। এটিই হযরত আলী রাযি. হতে বর্ণিত।
আল্লাহ তাআলার নির্দেশে হযরত আদম আ. সর্বপ্রথম এ ঘর নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত নূহ আ. এর যুগে প্লাবনে ঘরটি বিধ্বস্থ হয়ে গেলে হযরত ইব্রাহীম আ. এর পুনঃনির্মাণ করেন। এরপর কোন কারণে বিধ্বস্থ হলে জুরহুম গোত্রের লোকেরা পুনঃনির্মাণ করে। এরপর পঞ্চমবার বিধ্বস্থ হলে কুরাইশরা নির্মাণ করে। এ নির্মাণকাজে খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নিজ হাতে হাজারে আসওয়াদ স্থাপন করেন যার ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। কিন্তু এবার নির্মাণকালে কুরাইশরা কা’বাঘরে কিছুটা পরিবর্তন ঘটায়। যেমন,
এক. হযরত ইব্রাহীম আ. যে বুনিয়াদের উপর ঘর নির্মাণ করেছিলেন তা থেকে কিছু অংশ বাদ দিয়ে নির্মাণ করে যা হাতীম নামে অভিহিত।
দুই. কা’বাঘরের দরজা ছিল দুইটি। একটি পূর্বমুখী আরেকটি পশ্চিমমুখী। তারা পূর্বমুখী দরজাটি বহাল রাখে আর পশ্চিমমুখীটি বন্ধ করে দেয়।
তিন. কা’বাঘরের দরজা ভূমি থেকে বেশ উঁচু করে ফেলে যেন যে কেউ অনায়াসে ঘরে প্রবেশ করতে না পারে। বরং যাকে তারা অনুমতি ও সুযোগ দিবে সেই প্রবেশ করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, আয়েশা! আমার মনে চায় কা’বাঘরের বর্তমান নির্মাণ কাঠামো ভেঙ্গে দিয়ে হযরত ইব্রাহীম আ. নির্মিত কাঠামো অনুযায়ী নির্মাণ করি। কিন্তু নওমুসলিম কুরাইশদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা বোধ করছি তাই আপন অবস্থায় রেখে দিচ্ছি। এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর বেশি দিন ইহজগতে প্রাণাবদ্ধ থাকেননি।
কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. এর ভাগ্নে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. আপন খালা হযরত আয়েশা রাযি. থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এ উক্তিটি শুনেছিলেন। তাই তিনি যখন মক্কার খলীফা নিযুক্ত হন তখন তিনি কা’বাঘরের এ কাঠামো বিলুপ্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাসনা অনুযায়ী এবং হযরত ইব্রাহীম আ. এর কাঠামো অনুযায়ী নির্মাণ করেন। এতে হাতীমকে কা’বাঘরের অন্তর্ভুক্ত করেন, পশ্চিমমুখী আরেকটি দরজা খুলেন এবং দরজা নিচু করে দেন।
কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. এর হুকুমত বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিন পরই কিংবদন্তি জালেম হাজ্জাজ বিন ইউসুফ পবিত্র মক্কায় হামলা করে তাঁকে শহীদ করে দেয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি. এর এ কীর্তি পৃথিবীতে আম্লান ও অক্ষুণ্ন থাকুক, জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করুক এবং বিশ্বমুসলিম তাঁর প্রশংসা করুক এটা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ও তৎকালীন আমীর আব্দুল মালিক ইবেন মারওয়ান এর সহ্য হল না। তাই তারা এ বাহানা করল যে, বাইতুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে যে কাঠামোতে ছিল সে কাঠামো অনুযায়ী থাকা চাই। অব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এতে যে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তা ঠিক করে নাই। এ বলে পুনরায় খানায়ে কা’বাকে পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যায়।
পরবর্তীকালে কোন মুসলিম বাদশাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইরশাদ ও বাসনা অনুযায়ী হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নির্মিত কাঠামো ভেঙ্গে পূর্ব কাঠামো অনুযায়ী নির্মাণ করার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন। কিন্তু তৎকালীন প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম মালেক রহ. এতে বাধা প্রদান করেন এবং যুক্তিস্বরূপ বলেন, যদি এ সুযোগ দেওয়া হয় তবে প্রত্যেক বাদশাহই নিজ নিজ খ্যাতি অর্জনের জন্য কিছুদিন পর পর খানায়ে কা’বাকে ভাঙ্গবে-গড়বে। এতে খানায়ে কা’বা মানুষের হাতের খেলনায় পরিণত হয়ে যাবে যা খানায়ে কা’বার সম্মান ও মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অতএব খানায়ে কা’বা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকতে দেওয়া হোক। তখনকার সমস্ত উলামায়ে কেরাম ইমাম মালেক রহ. এর এ ফতোয়াকে সমর্থন করেন। যার ফলে এর উপর ইজমা হয়ে যায়। তাই অদ্যাবধি হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নির্মিত কাঠামোই অক্ষুণœ রয়েছে অবশ্য সময়-সময় সাময়িক মেরামত অবশ্যই সাধিত হচ্ছে।
مُبٰرَكًا বরকতময়”
বরকত অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, আধিক্য। এ বরকত দু’ ধরনের হতে পারে। যথা,
এক. দৃশ্যমান বা বস্তুগত।
দুই. অদৃশ্য বা অর্থগত। খানায়ে কা’বার সাথে এ দু’ ধরনের বরকতই সম্পৃক্ত।
দৃশ্যমান বা প্রকাশ্য বরকত হচ্ছে- মক্কানগরী পুরোটাই পাহাড় পর্বতে ঘেরা এবং মরুভূমি। সেখানে কোন ফল-ফসল তরি তরকারি উৎপন্ন হয় না কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে এসব কিছু সর্ব মৌসুমে ও সর্বকালে প্রচুর পরিমাণে মজুত থাকে। কোন অভাব কখনও পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি হজ্জের মৌসুমে যখন প্রতিটি মুসলিম দেশ থেকে লক্ষ লক্ষ হজ্জযাত্রীর আগমনে বিপুল সংখ্যক লোকের সমাবেশ ঘটে তখনও কোন খাদ্য দ্রব্যের অভাব ও সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এত বিপুল সংখ্যক পশু কুরবানী হচ্ছে কিন্তু কখনও পশুর সংকট হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এসব ঐ মহান ঘরেরই বরকত।
আর অপ্রকাশ্য বা অর্থগত বরকত হচ্ছেÑ অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যার সওয়াব ও অতি বিরাট যেমন হজ্জ ও ওমরা এর সম্পর্কও বিশেষভাবে এ ঘরের সাথেই। এমনিভাবে অন্য ইবাদত যেমন, নামায অন্যত্র আদায় করার তুলনায় মসজিদে হারামে আদায় করা হলে বহুগুণ বেশি সওয়াব লাভ হয়। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন, কেউ যদি ঘরে একা নামায আদায় করে তবে এক নামাযের সওয়াব লাভ হবে, যদি মহল্লার মসজিদে (জামাতের সাথে) আদায় করে তাহলে পঁচিশ নামাযের সওয়াব লাভ হবে, যদি জামে মসজিদে আদায় করে তবে পাঁচশত নামাযের সওয়াব লাভ হবে, যদি মসজিদে আকসায় আদায় করে তবে এক হাজার নামাযের সওয়াব লাভ হবে আর যদি আমার মসজিদে অর্থাৎ মসজিদে নববীতে আদায় করে তবে পঞ্চাশ হাজার নামাযের সওয়াব লাভ হবে আর যদি মসজিদে হারামে আদায় করে তবে এক লক্ষ নামাযের সওয়াব লাভ হবে। (উল্লেখ্য যে, এক লক্ষ নামাযের সওয়াব মসজিদে নববীর নামাযের তুলনায়, সাধারণ মসজিদের তুলনায় নয় যা অপর রেওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায়।)
এমনিভাবে হজ্জ উমরার মাধ্যমে (যার সম্পর্ক বাইতুল্লাহর সাথে) গোনাহ ও দারিদ্র্য মোচন হয়। এসব কিছুই বরকত যেগুলো প্রকাশ্য ও বস্তগত বরকতের তুলনায় অনেক মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ।
وَّهُدًی لِّلْعٰلَمِیْنَ বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াত বা পথপ্রদর্শনের মাধ্যম”
খানায়ে কা’বা হেদায়াত ও দিকনির্দেশনার মাধ্যম অনেকভাবেই। তবে বিশেষ করে নামাযের মত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের কেবলা অর্থাৎ নামায আমরা কোন্ দিকে ফিরে আদায় করবো এ বিষয়ের দিকনির্দেশনা এই পবিত্র ঘরের মাধ্যমেই লাভ হচ্ছে। (মাআরেফুল কুরআন)
খানায়ে কা’বার যেসব মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের কথা এ পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি সেগুলো তো আছেই তাছাড়া আরেকটি মাহাত্ম্য ও মর্যাদার বিষয় রয়েছে যে একটি বিষয়ই এ ঘরের মর্যাদার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সেটি হচ্ছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ ঘরের সম্বন্ধ নিজ সত্তার দিকে করে এর নাম রেখেছেন বাইতুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর। অতএব আল্লাহ যেমন মহান ও মহীয়ান তাঁর সাথে সম্বন্ধযুক্ত ঘরও তেমনি মহান মর্যাদার অধিকারী।
আল্লাহ তাআলা তঁর এ ঘরের মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করুন এবং সমস্ত মুসলমানের অন্তরে এর মর্যাদাবোধ ও মহব্বত সৃষ্টি করে দিন। আমীন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন