আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী আল-আযহারী
প্রায় ষাট বছর আগের কথা। সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থল বন্দর বাজারের একটি সাইনবোর্ডে ‘সৈয়দ মোতাহার হোসেনের গাঁজার দোকান’ লেখা দেখে চমকে উঠেছিলাম। ঐ কিশোর বয়সেই ঐ সাইনবোর্ডটি অন্তরে দাগ কেটেছিল। কেননা, সৈয়দ বলতে আমরা নবীবংশের লোকজনকেই বুঝে থাকি। স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য গাঁজার দোকান তাঁর বংশধর বলে পরিচয় দানকারী কোন ব্যক্তি এভাবে সগৌরবে সাইনবোর্ড টানিয়ে চালিয়ে যেতে পারে- তা ভেবে সেই বার বছর বয়সেই বিস্মিত হয়েছিলাম। মুরতাদ টাঙ্গাইলীর বিগত ২৮ শে সেপ্টেম্বর তারিখে নিউইয়র্কের টাঙ্গাইল প্রবাসীদের একটি সভায় প্রদত্ত বকোয়াস শুনে ষাট বছরের পুরনো সে যুগপৎভাবে বিস্ময়কর ও হাস্যকর সে সাইনবোর্ডটির কথা মনে পড়ে গেল!
সাইনবোর্ডে উল্লেখিত সে লোকটি প্রকৃতই সৈয়দ বংশের লোক ছিল কিনা অথবা আদৌ সে কোন শিক্ষিত লোক ছিল, নাকি নেহাতই একটা গেঁয়ো মূর্খ অশিক্ষিত লোক ছিল- তা জানা নেই। তবে টাঙ্গাইলের যে মুরতাদটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ সদস্য বিশিষ্ট বিশাল টিমের সাথে সরকারী অর্থে জাতিসংঘে তথা মার্কিন মুল্লুক সফরে গিয়েছিল তাকে তো বহুকাল ধরেই একজন ডাকসাইটে আওয়ামী নেতা এবং আমাদের সর্বাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দেশ বলে কথিত ও স্বীকৃত বাংলাদেশের একজন দায়িত্বপূর্ণ মন্ত্রীরূপেই আমরা চিনে এসেছি। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে নাকি একটা বিশাল পাঠাগারও রয়েছে! মানে, লোকটিকে অশিক্ষিত বা অজ্ঞাতপরিচয় বলে অভিহিত করাও চলে না। লোকটির মদ্যবিলাস বা অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার ব্যাপারেও আমাদের কিছু জানা নেই। তবে সে যে হাড়ে হাড়ে একটা বদমাশ, খুনী এবং ইসলাম বিদ্বেষী মোনাফেক, তা তো তার নিজস্ব বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
তার মুরতাদ হওয়ার ব্যাপারটা তো দিবালোকের মত স্পষ্ট। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের আদৌ কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তার খুনী হওয়ার পরিচয় সে বিগত পাঁচই জানুয়ারীর নির্বাচনকালীন গণআন্দোলনের সময় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই তার ঘোষণার মাধ্যমেই দিয়ে দিয়েছিল যে, হরতালকারীদেরকে তাদের ঘরে ঘরে ঢুকে গিয়ে হত্যা করতে হবে। আর তার বদমাশ দুর্নীতিবাজ হওয়ার পরিচয় সে দিয়েছে প্রায় অর্ধশত পাট ও বস্ত্রকল ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিয়ে জাতির হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ পানির দামে বেচে দিয়ে। তার বকোয়াস প্রকাশের সাথে সাথে দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদকীয় কলামে প্রকাশিত অভিযোগে তা-ই ব্যক্ত করা হয়েছিল।
পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, এরূপ নাস্তিক মুরতাদ ও বদমাশ তো এদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে আরো অনেকেই রয়েছে। তাহলে মুরতাদ টাঙ্গাইলীকে নিয়ে বিস্ময়ের কী-ইবা আছে? তারই স্বজেলা তথা বৃহত্তম মোমেনশাহী জেলার জরায়ুর স্বধীনতাকামী তসলিমা নাসরীন, ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ এর লেখক সালমান রুশদী কাশ্মিরী, ‘অন্ধকারে জন্মখ্যাত’ দাউদ হায়দার এদের প্রত্যেকের নামই তো চোস্ত আরবী ইসলামী গন্ধে ভরপুর! তাহলে একে নিয়ে আর এত বিস্ময় প্রকাশের কী আছে?
বিস্ময়ের প্রথম ব্যাপারটা হচ্ছে, সে তার নাম লিখে থাকে আবদুল লতীফ সিদ্দীকি। এ যেন রীতিমত আমগাছে মাকাল ফল! অথবা সিংহের ঔরসে চামচিকার জন্ম আর কী! অথচ লোক দেখানো হজও নাকি লোকটি ইতিপূর্বেই করে এসেছিল! তার পরিবার সিদ্দীকি পরিবার বলেই পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। তার ভাই বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের সিদ্দীকিকে বঙ্গবীর খেতাব দিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তিনি আজকাল ধর্মকর্মও করে থকেন এবং ইনশাআল্লাহ, মা শা আল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করে পত্রিকায় কলাম লিখেন। টিভি টকশোতে অংশ গ্রহণ করেন- যদিও আওয়ামী ঘরানার লোকজন তাদের দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে আজকাল তাঁকে ডাকাত, লুটেরা, রাজাকার প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষায়িত করে তাঁর চরিত্রহনন করে থাকেন। যদি তাদের বংশ পরিচয় সত্যি হয়ে থাকে- তার পক্ষে বা বিপক্ষে আমার কাছে কোন প্রমাণ নেই বা এ ব্যাপারে আমার কোন মাথাব্যথাও নেই- তাহলে বুঝতে হবে এরা ইসলামের ইতিহাসের অবিসংবাদিত ও সর্বাধিক সম্মানিত খলীফা হযরত আবূ বকর রাযি. এর বংশধর। কে ছিলেন এই হযরত আবূ বকর রাযি.? তিনি হচ্ছেন সেই সর্বাধিক সত্যপ্রাণ পুরুষ- যিনি বিনা বাক্যব্যয়ে সর্বপ্রথম ইসলামের নবীর প্রতি ঈমান এনে সর্বপ্রথম মুসলিম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
তাঁর সিদ্দীক উপাধী লাভের কারণটি সম্পর্কে ওরা হয়তো অজ্ঞ। অথবা তা জানা থাকলেও সে বিশ্বাসে তারা বিশ্বাসী নয়। ঘটনাটি ছিল এই, নবুওতের দশম বছরে অর্থাৎ ৬২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আল্লাহর নবী মে’রাজে গমন করেন। কুরআন শরীফে সূরা ইসরা বা সূরা বনী ইসরাঈলের শুরুই হয়েছে তাঁর মেরাজ গমনের ঘটনা দিয়ে। সে ছিল নিখিল বিশ্বের এক পরম বিস্ময়। একই রাতের মধ্যে তিনি মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে সুদূর বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুযালেমের মসজিদুল আকসায় গমন করেন। তারপরে ঊর্ধ্বাকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে স্বয়ং আল্লাহর আরশে তাঁর সামনে গিয়ে উপস্থিত হন এবং ঐ রাতেই আবার মক্কায় ফিরে আসেন। ঘটনাটি এতই আশ্চর্যজনক ছিল যে, প্রবল বিশ্বাসী ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই তা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। ফলে মুমিনগণ তা সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করলেন। মুনাফিকরা তো আদৌ মুমিন ছিল না, শুধু বাহ্যিকভাবে ঈমানদার বলে পরিচয় দিত- এই যা। কাফিরদের তো বিশ্বাস করার প্রশ্নই উঠে না। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভোরে ফজরের নামাযের পর তা ব্যক্ত করলেন তখন ঘটনাচক্রে হযরত আবূ বকর রাযি. সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কাফের সর্দাররা দেখল, আবূ বকরকে বিভ্রান্ত করার এটাই অপূর্ব সুযোগ। তারা হযরত আবূ বকর রাযি. এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, শুনেছো আবূ বকর! তোমার নবী আজ কী বলেছেন? তিনি বললেন, কী বলেছেন তিনি?
তারা বললো, তিনি আজ বলেছেন, গতরাতে তিনি নাকি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস তারপর সেখান থেকে একেবারে আরশে মুআল্লা পর্যন্ত সফর করে রাতের মধ্যেই আবার মক্কায় ফিরে এসেছেন!
হযরত আবূ বকর রাযি. বললেন, তিনি এরূপ বলেছেন নাকি? যদি তিনি এরূপ বলে থাকেন, তা হলে নিশ্চয়ই তিনি সে সফরটি করেছেন। আল-আমীন কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে ফেরেশতা জিব্রাঈল নিত্যদিনই যার কাছে আসেন, তাঁকে আল্লাহ যদি তাঁর নিজ দরবারে ডেকে নিয়ে যান আবার তিনি স্বল্প সময়েই আল্লাহর কুদরতে ফিরেও আসেন, তাতে আশ্চর্যের কী আছে? আমরা যখন ও সবই বিশ্বাস করি, তখন এ ঘটনায় অবিশ্বাস করার কী যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে?
হযরত আবূ বকর রাযি. এর এরূপ দৃঢ়তা, সত্যপরায়ণতা ও উচ্চমার্গের বিশ্বাস দেখে ঐ অতি উৎসাহী কাফির-সর্দাররা হতাশ হয়ে গেল! তাদের শেষ ফন্দিটাও আবূ বকর রাযি. এর বিশ্বাসের দৃঢ়তার সম্মুখে ব্যর্থ হয়ে গেল।
এ দিকে আল্লাহর রাসূলের কাছে এ সংবাদ পৌঁছতেই তিনি বললেন, আবূ বকর হচ্ছেন সিদ্দীক – সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যপ্রাণ ও ঈমানপ্রবণ ব্যক্তি। আজীবন নম্রস্বভাবের ঐ মহাপুরুষ খলীফা হয়েই সর্বপ্রথম যে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেছিলেন তা ছিল মুরতাদ দমন বা রিদ্দার যুদ্ধ। ঐ মুরতাদরা কিন্তু ইসলামের মৌলিক অন্য কোন ব্যাপারের প্রতিই বিদ্রোহ ঘোষণা করেনি। তারা কেবল ইসলামের যাকাত-বিধানের প্রতিই বিদ্রোহ করেছিল। হযরত আবূ বকর রাযি. তখন অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘যাকাত তো বড় কথা, যাকাতের পশুর গলার রশিটি দিতেও যদি কেউ অস্বীকৃতি জানায়, তবে আমি তার বিরুদ্ধেও লড়াই করবো।’ এ জন্যেই তিনি ছিলেন সিদ্দীকে-আকবর বা সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্দীক।
সেই সত্যপ্রাণ মহাপুরুষের রক্তধারা বহনকারী এবং এজন্য গর্ব করে ‘সিদ্দীকী’ শব্দটি নামের সাথে ব্যবহারকারী কোন ব্যক্তি বলতে পারে যে, ‘আব্দুল্লাহর বেটা মুহাম্মদ চিন্তা করে দেখল, তার দেশের মানুষ তো ডাকাত! ওরা খাবে কী করে? তাই বুদ্ধি করে তার অনুসারীদেরকে হজ্জ করার বিধান দিয়ে দিল যাতে আরবের লোকেরা খেতে পায়!’ নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক। ফার্সিতে একটি প্রবচন আছে, ‘নকলে কুফর কুফর না-বাশাদ’ অথাৎ কুফুরী বাক্য উদ্বৃত করলে কেউ কাফির হয়ে যায় না। তাই ওর ভাষাটা হুবহুই উদ্ধৃত করলাম। এই হল ঐ খবীসটির চিন্তাধারা। সেখানে ঐ শুয়রের গলায় সিদ্দীকি তঘমাটি কী করে মানানসই হতে পারে? শুয়রের গলায় কি মণিমুক্তো শোভা পায়? এটাই আমাদের বিস্ময়ের আসল কারণ।
আমার বিস্ময়ের দ্বিতীয় ব্যাপারটি হল, বঙ্গবন্ধুর মত একজন জহুরী লোক কী করে ঐ মুনাফিক লোকটিকে এত দীর্ঘকাল না চিনে আস্থায় রাখলেন? বঙ্গবন্ধু কোন দেবদূত ছিলেন না। তিনি ছিলেন অন্য দশজনের মতই দোষে-গুণে গড়া একজন মাটির মানুষ। তাঁর জীবনেও নিশ্চয়ই অনেক মানবীয় ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল ও সীমাবদ্ধতা ছিল; কিন্তু অনেক সংগ্রাম-সাধনা ও ত্যাগ-তীতিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছেন। আমরা লাভ করেছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, একটি পতাকা, একটি পরিচিতি। তাঁর লোকচেনার ক্ষমতা বিশেষ করে স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। এমন একটি লোককে এমন একটি কপট অবিশ্বাসী লোক কী করে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল নিজেকে বিশ্বাসী ও বিশ্বস্ত বলে পরিচয় দিয়ে? সে যে বিশ্বাসী বা বিশ্বস্ত কোনদিন ছিল না, তা তো আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট। ইসলামের, ইসলামের নবীর বা কুরআনের প্রতি তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বা ভক্তি শ্রদ্ধা নেই। নেই বঙ্গবন্ধু-পরিবারের প্রতিও বিন্দুমাত্র বিশ্বস্ততা। তাই বঙ্গবন্ধু-দৌহিত্রও তার চক্ষুশূল! একেই বিশ্বাস করে গেলেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা হাসিনা ওয়াজেদ?
বঙ্গবন্ধুর ইসলামে বিশ্বাস ছিল অকৃত্রিম। আমি যখন বাংলাদেশ আমলের শুরুতেই বাংলাদেশ জমিয়তুল মুদার্রিসীনের প্রথম সভাপতি, বাংলাদেশ সীরাত মজলিসের মহাসচিব এবং আমারই গড়া ইসলামী শিক্ষা সংস্কার সংস্থার সাধারণ সম্পাদকরূপে তাঁর সাথে ঘণিষ্ঠভাবে মেলা-মেশার সুযোগ পেয়েছি। তখন তাঁকে অত্যন্ত নিকট থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বারবার গণভবনে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ইসলামের শিক্ষা ও কুরআনের আলোকে তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শাদি দিয়েছি। প্রত্যেকটি কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে নবী দিবসের ধর্মীয় মাহফিলে প্রধান অতিথিরূপে এসেছেন। আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জমিয়তুল মুদার্রিসীনের কনফারেন্সে হাযির হয়েছেন। আমার দাবী মতে বেতার টি.ভি থেকে নির্বাসিত কুরআন তেলাওয়াত চালু করেছেন। সে সময় আমাদের পরামর্শ মতেই তিনি সৌদী সরকারের স্বীকৃতি না দেয়া সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে মক্কায় হাজীভর্তি বিমান পাঠিয়েছেন। বিনা অনুমতিতে জিদ্দায় অবতরণের জন্য ঐ সময় সৌদী সরকার বাংলাদেশ বিমানকে পঁচিশ হাজার ডলার জরিমানাও করেছিল। পরবর্তীতে বিমান কায়রোতে চলে যায় এবং তৎকালীন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতের সুপারিশে হাজীদের হজের ব্যবস্থা হয়। ইসলামিক একাডেমির ছোট পরিসর থেকে আমাদেরই পরামর্শমতে ও শহীদ মওলানা অলিউর রহমানের স্বপ্নের ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্পরূপে ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠিত হয় যার বর্তমান জনবল বিয়াল্লিশ হাজার ও শাখাসংখ্যা চার শতাধিক।
বঙ্গবন্ধু ভারতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লাহোরের ওআইসি কনফারেন্স তথা বিশ্ব মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মেলনে যোগদান করেন। তাবলীগের বিশ্ব ইজতেমার জন্যে জমি বরাদ্দ দেন। ঐ সময় আমি ও আমার ভাই উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী ছাড়া অপর যে মনীষী আলেম বঙ্গবন্ধুর কাছে সম্মান পেতেন তিনি হচ্ছেন কাকরাইল মারকাযের মুরব্বী নোয়াখালীর আমিষাপাড়াবাসী হযরত মওলানা মুনীর আহমদ রহ.। একাধিকবার গণভবনেই ঐ সময় তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে। তাবলীগের ব্যাপারগুলো নিয়ে প্রধানত তিনিই বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করতেন।
বঙ্গবন্ধু গর্ব করে বলতেন, ‘আমরা মাঝিভাই নৌকার গলুইতে দাঁড়িয়ে, আমার চাষী ভাই জমিনের আইলে দাঁড়িয়ে কাঁদা মাঠে গায়ে গামছা পরে নামায আদায় করে, এটা আমার গর্ব। সেই বঙ্গবন্ধুর পার্শ্বচর হয়ে দীর্ঘকাল রইলো আবদুল লতীফ টাঙ্গাইলীর মত একটা আস্ত মুরতাদ!
সে যে একটা কট্টর মুরতাদ এবং জ্ঞানতই সে তা করেছে তার বড় প্রমাণ হল, গত ১৩ ই অক্টোবরও কোলকাতায় অবতরণ করে সে বলেছে, সে যা বলেছে, তা বুঝে শুনেই বলেছে এবং এজন্য সে মোটেও অনুতপ্ত নয়। এমতাবস্থায় বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দীকি যখন নিজের বউবাচ্চাসহ সংবাদ সম্মেলন করে এ জন্যে পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান, তখন তা বড্ডই বে-মানান, বড্ডই হাস্যকর ঠেকে। একান্ত তাঁরই জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. এর জ্যেষ্ঠ সন্তান ও উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা রাযি. এর বড়ভাই আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকর রাযি. (মৃত্যু ৫৩ হিজরী) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন অনেক; দেরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর। তিনি একদা হযরত আবূবকর রাযি. কে লক্ষ করে বললেন, ‘আব্বাজান! আমি কিন্তু একদা যুদ্ধে (সম্ভবত বদর বা ওহুদ যুদ্ধে) আপনাকে আমার একেবারে তলোয়ারের আওতায়ই পেয়েছিলাম, ইচ্ছে করলেই আপনার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারতাম!’ হযরত আবূবকর রাযি. জবাবে বলেছিলেন, ‘বৎস! আমি যদি তোমাকে এরূপ আওতায় পেতাম, তবে অবশ্যই হত্যা করতাম!’
তাঁর এ বক্তব্যটি ছিল একজন মুসলমানের, একজন সিদ্দীকের বক্তব্য। মুসলমান ইসলামের স্বার্থে জানমাল আওলাদ সবকিছুই ত্যাগ করতে পারে, সবকিছুর মায়া বিসর্জন দিতে পারে! তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا يُؤْمِنُ اَحَدُكُمْ حَتَّى اَكُونَ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ اَجْمَعِينَ
তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতাপুত্র এমনকি দুনিয়ার সকল মানুষ থেকে প্রিয়তর না হবো। বুখারী : ১৪
হযরত উমর রাযি. বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্পর্কে কী করতে হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, ওদেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে হবে। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ শত্রুদের গর্দান নিজেরাই মারবো।
প্রতি রাতে বেতেরের নামাযকালে দুআ কুনুত পড়ে আমরা আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ ব্যক্ত করে বলে থাকি,
وَنَتْرُكُ مَنْ يَّفْجُرُكَ
হে আল্লাহ! তোমার না-ফরমানদেরকে আমরা পরিত্যাগ করি!
এমতাবস্থায় ‘ভাই বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না’ ‘ভাইয়ের সাথে আজীবন শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকবে’ এরূপ বক্তব্য ইসলামের দৃষ্টিতে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া একের অপরাধে অন্যের ক্ষমা চাওয়ার বা শাস্তি পাওয়ার কোন বিধানই ইসলামে নেই। তাই অগ্রজ মুরতাদ হয়ে গেছে বলে যেমন আপনার ব্যক্তিজীবন বা রাজনীতি প্রভাবান্বিত হতে পারে না, তেমনি তার পক্ষ থেকে আপনার ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটাও অবান্তর ও অগ্রহণযোগ্য- বিশেষত ঐ মুরতাদটি যখন তার পরও দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, সে যা বলেছে ঠিকই বলেছে, বুঝেশুনেই বলেছে! এমতাবস্থায় বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দীকিকে একজন মুসলামান হিসাবেই তাঁর কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে! তাঁকে তাঁর বংশের আদি পুরুষের দৃঢ়তার দৃষ্টান্তই অনুসরণ করতে হবে। কেননা, ঈমানের ব্যাপারটাতে আপোস করার বা একজন বেঈমান মুরতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সহযোগিতা সহমর্মিতা প্রকাশ একটি অপরাধ বৈ নয়! ইসলামে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু ইসলামের বিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন ও অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান একটি অমার্জনীয় অপরাধ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কটাক্ষমূলক বক্তব্যের জন্যে যেখানে আমাদের অতি উৎসাহী পুলিশ ইন্টারনেট খুঁজে খুঁজে বিরোধীদেরকে গ্রেফতার করে আর বিচারক বা আদালত কারাদণ্ড পর্যন্ত দিয়ে দেয়, সেখানে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ঈমান-বিশ্বাসের প্রতি জঘন্য মন্তব্যকারীর বিচারটি কীরূপ হওয়া উচিত?
মুরতাদ টাঙ্গাইলী হজ সম্পর্কে যে ইতর ব্যাখ্যা দিয়েছে তা যেমন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যথার্থ নয় তেমনি তা ইতিহাস সম্পর্কে তার অজ্ঞতারই প্রমাণবহ। পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক লেখকের বইই তার পাঠাগারে থাকওে আল্লাহর কুরআনখানাও সে কোনদিন পড়ে দেখেনি। আর পড়লেও তা বিশ্বাস করেনি। কুরআন শরীফের সূরা হজটি পড়লেই তার চোখ খুলে যেতো। হজ প্রচলিত রয়েছে আদিমানব হযরত আদম আ. এর যুগ থেকেই। জাহিলিয়তযুগের মূর্তিপূজারী আরবরাও হজ পালন করতো। সুতরাং আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্বজাতির অর্থনৈতিক প্রাপ্তির জন্যে হজ চালু করে গেছেন এরূপ বক্তব্য চরম মূর্খতাব্যঞ্জক।
হজ ও তাবলীগী ইজতেমাই আমাদের বিমান ও পর্যটন সংস্থাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এ দু’টি খাতের আয় বাদ দিলে বিমান কর্তৃপক্ষ বা পর্যটন মন্ত্রণালয় মুখ থুবড়ে পড়বে। একটু খোঁজখবর নিয়ে পরিসংখ্যান নিলে আমাদের এ কথার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। এ দু’টি খাত না থাকলে আমাদের এ বিমান কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় এর আয় থেকে তাদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতাও চলতে পারবে না। বিষয়টি সকলেরই দৃষ্টি কী করে এড়িয়ে যাচ্ছে আশ্চর্য!
আওয়ামী লীগ সরকার মুরতাদ সিদ্দীকিকে মন্ত্রীসভা ও দলের উচ্চপর্যায়ের কমিটি থেকে বাদ দিলেও তার যথাযথ বিহিত ও শাস্তির ব্যবস্থা না করলে দেশবাসী এটাকে তার জয়বিরোধী মন্তব্য এবং প্রতিমাসে মার্কিনমুল্লুকে বসতরত প্রধানমন্ত্রীপুত্রের এক কোটি ষাট লাখ টাকা বেতন গ্রহণের গোপনীয় তথ্য ফাঁসের অপরাধের শাস্তি বলেই ধারণা করবে। তাই তার যথাযথ শাস্তি বিধান করে সর্বপ্রকার সংশয়-সন্দেহ দূর করাটাই এখন সরকারের দায়িত্ব।
সর্বশেষ একটি কথা না বললেই নয়, আওয়ামী লীগ সরকার চালাচ্ছে, নাকি বি এন পি আমাদের বৃহত্তর আলেম সমাজ বা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মানুষের এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থাই সামান্য একটু রদবদল করে দেশ চলছে। বাংলাদেশই বলুন আর পাকিস্তানই বলুন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনতার ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে দেশ চলছে না। শাসনক্ষমতা আলেম সমাজ বা ধর্মীয় নেতাদের হাতে নেই, এটাই সত্য কথা। সুতরাং ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা চলবে, এটা অনেকটা অকল্পনীয়। তারপরও কথা আছে। রাষ্ট্রটি কিন্তু সকলের। এ রাষ্ট্রের ইমেজের সাথে আমাদের সকলেরই ভাগ্য জড়িত। দেশের ইমেজ বৃদ্ধিতে বহির্বিশ্বে আমাদের নাগরিকদের মর্যাদা বৃদ্ধি ঘটে, সরকার ইমেজসংকটে পতিত হলে বিশ্বসমাজে আমাদের মর্যাদাহানি ঘটে। বিংশ শতকের মধ্যভাগে যে ভারতবর্ষের বুক চিরে এক ফালি বিভক্ত ভূমি নিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ে উঠে বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল এর মূল কৃতিত্বটি ছিল এই বাঙ্গালী মুসলমানদেরই। পাকিস্তান হয়েছিল বলেই সংখ্যায় সর্ববৃহৎ বা পবিত্রতার দিকে থেকে মক্কামদীনার সমমর্যাদাসম্পন্ন না হলেও বিশ্বে আমাদের স্বীকৃতি ছিল বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্ররূপে। রাজনৈতিক নেতাদের অবিমৃষ্যকারিতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে ঐ পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মধ্য থেকেই নতুনভাবে ভাগ্যান্বেষণের উদ্দেশ্যে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। তারপরও পাকিস্তানের চাইতে আমাদের ধর্মীয় ইমেজ ছিল উন্নততর।
কতিপয় ভ্রষ্ট ব্লগারের ইসলাম বিরোধী প্রচারণা, তার পেছনে আবার রাষ্ট্রীয় ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, সর্বোপরি শাপলাচত্বরে গভীর নিশীথে লাখ লাখ আলেমের উপর অতি উৎসাহী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঘন্যতম হামলায় বিশ্বে আমাদের ইসলামী ইমেজ যে কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’ তা কেবল আরাফাত ফেরত হাজীরাই বলতে পারবেন। এবার আমাদেরই সরকারের ও সরকারী দলের উচ্চ পর্যায়ের একজন মন্ত্রী যখন জঘন্যতম ইসলামদ্রোহী মন্তব্য করেন তখন কেবল তাকে দলচ্যুত বা পদচ্যুত করেই সে ইমেজ উদ্ধার সম্ভব নয়। এ জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বমুসলিমের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা। কেননা, হজ বা তাবলীগের ব্যাপারটি গোটা মুসলিমবিশ্বের ঈমান-বিশ্বাস ও চিন্তাচেতনার সাথে জড়িত। এটা কেবল বাংলাদেশের ব্যাপার নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি পারবেন এ সৎসাহসের পরিচয় দিতে? তা না হলে আল্লাহর দরবারে তো বটেই, আরাফাতের ময়দানেও প্রতিবছর আমাদের হাজীদের মাথা হেট করে থাকতে হবে!
সর্বশেষ সংবাদে জানা যায়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ জনতার অনুভূতির ভাষ্যকার ইসলামী দলসমূহ সম্মিলিতভাবে মুরতাদ আবদুল লতীফ সিদ্দীকিকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা দাবি করেছে। অন্যথায় তারা হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচী দিতে বাধ্য হবেন। অপরদিকে আওয়ামী ঘরানা ও সরকারের অন্যতম বলিষ্ঠ ভাষ্যকার সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করলেন- আবদুল লতীফ সিদ্দীকি দেশে ফিরলে সরকার তার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সরকার নীরব সমর্থন জানিয়ে গেলেন! এটা কী এ কথারই স্পষ্ট প্রমাণ নয় যে, সরকার আদৌ তার বিচারে আগ্রহী নন। স্বয়ং আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে যেখানে মফস্বল অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মুরতাদ আবদুল লতীফ সিদ্দীকির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেখানে এ ব্যাপারে সরকারের অনীহা কি তাকে কৌশলে আইনের আওতা থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াস নয়?
আমরা মনে করি, তা আমাদের রাষ্ট্রীয় ইমেজসঙ্কট দূরীকরণের আদৌ সহায়ক হবে না। বিশ্বমুসলিম আমাদেরকে একটি ইসলামবিরোধী শক্তির দাপটের নিচে চাপা পড়া অসহায় মুসলিম জনপদ বলেই মূল্যায়ন করবে। এটা কী মেনে নেয়া যায়?
বঙ্গবন্ধ আমাদের পরামর্শ মতে কাজ করে বাংলাদেশ আমলের শুরুতে আমাদের রাষ্ট্রীয় ইমেজ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তারপর আমাদেরকে পুরোপুরিই এ সঙ্কট থেকে মুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা কি ঐ উত্তম উদাহরণগুলো অনুসরণ করে আমাদের এ নব্য সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন?
সাইনবোর্ডে উল্লেখিত সে লোকটি প্রকৃতই সৈয়দ বংশের লোক ছিল কিনা অথবা আদৌ সে কোন শিক্ষিত লোক ছিল, নাকি নেহাতই একটা গেঁয়ো মূর্খ অশিক্ষিত লোক ছিল- তা জানা নেই। তবে টাঙ্গাইলের যে মুরতাদটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর ১৮০ সদস্য বিশিষ্ট বিশাল টিমের সাথে সরকারী অর্থে জাতিসংঘে তথা মার্কিন মুল্লুক সফরে গিয়েছিল তাকে তো বহুকাল ধরেই একজন ডাকসাইটে আওয়ামী নেতা এবং আমাদের সর্বাধিক ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দেশ বলে কথিত ও স্বীকৃত বাংলাদেশের একজন দায়িত্বপূর্ণ মন্ত্রীরূপেই আমরা চিনে এসেছি। তার ব্যক্তিগত সংগ্রহে নাকি একটা বিশাল পাঠাগারও রয়েছে! মানে, লোকটিকে অশিক্ষিত বা অজ্ঞাতপরিচয় বলে অভিহিত করাও চলে না। লোকটির মদ্যবিলাস বা অপ্রকৃতিস্থ হওয়ার ব্যাপারেও আমাদের কিছু জানা নেই। তবে সে যে হাড়ে হাড়ে একটা বদমাশ, খুনী এবং ইসলাম বিদ্বেষী মোনাফেক, তা তো তার নিজস্ব বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
তার মুরতাদ হওয়ার ব্যাপারটা তো দিবালোকের মত স্পষ্ট। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের আদৌ কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তার খুনী হওয়ার পরিচয় সে বিগত পাঁচই জানুয়ারীর নির্বাচনকালীন গণআন্দোলনের সময় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই তার ঘোষণার মাধ্যমেই দিয়ে দিয়েছিল যে, হরতালকারীদেরকে তাদের ঘরে ঘরে ঢুকে গিয়ে হত্যা করতে হবে। আর তার বদমাশ দুর্নীতিবাজ হওয়ার পরিচয় সে দিয়েছে প্রায় অর্ধশত পাট ও বস্ত্রকল ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিয়ে জাতির হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ পানির দামে বেচে দিয়ে। তার বকোয়াস প্রকাশের সাথে সাথে দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদকীয় কলামে প্রকাশিত অভিযোগে তা-ই ব্যক্ত করা হয়েছিল।
পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, এরূপ নাস্তিক মুরতাদ ও বদমাশ তো এদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে আরো অনেকেই রয়েছে। তাহলে মুরতাদ টাঙ্গাইলীকে নিয়ে বিস্ময়ের কী-ইবা আছে? তারই স্বজেলা তথা বৃহত্তম মোমেনশাহী জেলার জরায়ুর স্বধীনতাকামী তসলিমা নাসরীন, ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ এর লেখক সালমান রুশদী কাশ্মিরী, ‘অন্ধকারে জন্মখ্যাত’ দাউদ হায়দার এদের প্রত্যেকের নামই তো চোস্ত আরবী ইসলামী গন্ধে ভরপুর! তাহলে একে নিয়ে আর এত বিস্ময় প্রকাশের কী আছে?
বিস্ময়ের প্রথম ব্যাপারটা হচ্ছে, সে তার নাম লিখে থাকে আবদুল লতীফ সিদ্দীকি। এ যেন রীতিমত আমগাছে মাকাল ফল! অথবা সিংহের ঔরসে চামচিকার জন্ম আর কী! অথচ লোক দেখানো হজও নাকি লোকটি ইতিপূর্বেই করে এসেছিল! তার পরিবার সিদ্দীকি পরিবার বলেই পরিচিত হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। তার ভাই বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের সিদ্দীকিকে বঙ্গবীর খেতাব দিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তিনি আজকাল ধর্মকর্মও করে থকেন এবং ইনশাআল্লাহ, মা শা আল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করে পত্রিকায় কলাম লিখেন। টিভি টকশোতে অংশ গ্রহণ করেন- যদিও আওয়ামী ঘরানার লোকজন তাদের দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে আজকাল তাঁকে ডাকাত, লুটেরা, রাজাকার প্রভৃতি বিশেষণে বিশেষায়িত করে তাঁর চরিত্রহনন করে থাকেন। যদি তাদের বংশ পরিচয় সত্যি হয়ে থাকে- তার পক্ষে বা বিপক্ষে আমার কাছে কোন প্রমাণ নেই বা এ ব্যাপারে আমার কোন মাথাব্যথাও নেই- তাহলে বুঝতে হবে এরা ইসলামের ইতিহাসের অবিসংবাদিত ও সর্বাধিক সম্মানিত খলীফা হযরত আবূ বকর রাযি. এর বংশধর। কে ছিলেন এই হযরত আবূ বকর রাযি.? তিনি হচ্ছেন সেই সর্বাধিক সত্যপ্রাণ পুরুষ- যিনি বিনা বাক্যব্যয়ে সর্বপ্রথম ইসলামের নবীর প্রতি ঈমান এনে সর্বপ্রথম মুসলিম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
তাঁর সিদ্দীক উপাধী লাভের কারণটি সম্পর্কে ওরা হয়তো অজ্ঞ। অথবা তা জানা থাকলেও সে বিশ্বাসে তারা বিশ্বাসী নয়। ঘটনাটি ছিল এই, নবুওতের দশম বছরে অর্থাৎ ৬২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আল্লাহর নবী মে’রাজে গমন করেন। কুরআন শরীফে সূরা ইসরা বা সূরা বনী ইসরাঈলের শুরুই হয়েছে তাঁর মেরাজ গমনের ঘটনা দিয়ে। সে ছিল নিখিল বিশ্বের এক পরম বিস্ময়। একই রাতের মধ্যে তিনি মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে সুদূর বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুযালেমের মসজিদুল আকসায় গমন করেন। তারপরে ঊর্ধ্বাকাশের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে স্বয়ং আল্লাহর আরশে তাঁর সামনে গিয়ে উপস্থিত হন এবং ঐ রাতেই আবার মক্কায় ফিরে আসেন। ঘটনাটি এতই আশ্চর্যজনক ছিল যে, প্রবল বিশ্বাসী ব্যক্তিরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই তা মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। ফলে মুমিনগণ তা সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করলেন। মুনাফিকরা তো আদৌ মুমিন ছিল না, শুধু বাহ্যিকভাবে ঈমানদার বলে পরিচয় দিত- এই যা। কাফিরদের তো বিশ্বাস করার প্রশ্নই উঠে না। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ভোরে ফজরের নামাযের পর তা ব্যক্ত করলেন তখন ঘটনাচক্রে হযরত আবূ বকর রাযি. সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কাফের সর্দাররা দেখল, আবূ বকরকে বিভ্রান্ত করার এটাই অপূর্ব সুযোগ। তারা হযরত আবূ বকর রাযি. এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, শুনেছো আবূ বকর! তোমার নবী আজ কী বলেছেন? তিনি বললেন, কী বলেছেন তিনি?
তারা বললো, তিনি আজ বলেছেন, গতরাতে তিনি নাকি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস তারপর সেখান থেকে একেবারে আরশে মুআল্লা পর্যন্ত সফর করে রাতের মধ্যেই আবার মক্কায় ফিরে এসেছেন!
হযরত আবূ বকর রাযি. বললেন, তিনি এরূপ বলেছেন নাকি? যদি তিনি এরূপ বলে থাকেন, তা হলে নিশ্চয়ই তিনি সে সফরটি করেছেন। আল-আমীন কখনো মিথ্যা বলতে পারেন না। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে ফেরেশতা জিব্রাঈল নিত্যদিনই যার কাছে আসেন, তাঁকে আল্লাহ যদি তাঁর নিজ দরবারে ডেকে নিয়ে যান আবার তিনি স্বল্প সময়েই আল্লাহর কুদরতে ফিরেও আসেন, তাতে আশ্চর্যের কী আছে? আমরা যখন ও সবই বিশ্বাস করি, তখন এ ঘটনায় অবিশ্বাস করার কী যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে?
হযরত আবূ বকর রাযি. এর এরূপ দৃঢ়তা, সত্যপরায়ণতা ও উচ্চমার্গের বিশ্বাস দেখে ঐ অতি উৎসাহী কাফির-সর্দাররা হতাশ হয়ে গেল! তাদের শেষ ফন্দিটাও আবূ বকর রাযি. এর বিশ্বাসের দৃঢ়তার সম্মুখে ব্যর্থ হয়ে গেল।
এ দিকে আল্লাহর রাসূলের কাছে এ সংবাদ পৌঁছতেই তিনি বললেন, আবূ বকর হচ্ছেন সিদ্দীক – সর্বশ্রেষ্ঠ সত্যপ্রাণ ও ঈমানপ্রবণ ব্যক্তি। আজীবন নম্রস্বভাবের ঐ মহাপুরুষ খলীফা হয়েই সর্বপ্রথম যে চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেছিলেন তা ছিল মুরতাদ দমন বা রিদ্দার যুদ্ধ। ঐ মুরতাদরা কিন্তু ইসলামের মৌলিক অন্য কোন ব্যাপারের প্রতিই বিদ্রোহ ঘোষণা করেনি। তারা কেবল ইসলামের যাকাত-বিধানের প্রতিই বিদ্রোহ করেছিল। হযরত আবূ বকর রাযি. তখন অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘যাকাত তো বড় কথা, যাকাতের পশুর গলার রশিটি দিতেও যদি কেউ অস্বীকৃতি জানায়, তবে আমি তার বিরুদ্ধেও লড়াই করবো।’ এ জন্যেই তিনি ছিলেন সিদ্দীকে-আকবর বা সর্বশ্রেষ্ঠ সিদ্দীক।
সেই সত্যপ্রাণ মহাপুরুষের রক্তধারা বহনকারী এবং এজন্য গর্ব করে ‘সিদ্দীকী’ শব্দটি নামের সাথে ব্যবহারকারী কোন ব্যক্তি বলতে পারে যে, ‘আব্দুল্লাহর বেটা মুহাম্মদ চিন্তা করে দেখল, তার দেশের মানুষ তো ডাকাত! ওরা খাবে কী করে? তাই বুদ্ধি করে তার অনুসারীদেরকে হজ্জ করার বিধান দিয়ে দিল যাতে আরবের লোকেরা খেতে পায়!’ নাউযুবিল্লাহ মিন যালিক। ফার্সিতে একটি প্রবচন আছে, ‘নকলে কুফর কুফর না-বাশাদ’ অথাৎ কুফুরী বাক্য উদ্বৃত করলে কেউ কাফির হয়ে যায় না। তাই ওর ভাষাটা হুবহুই উদ্ধৃত করলাম। এই হল ঐ খবীসটির চিন্তাধারা। সেখানে ঐ শুয়রের গলায় সিদ্দীকি তঘমাটি কী করে মানানসই হতে পারে? শুয়রের গলায় কি মণিমুক্তো শোভা পায়? এটাই আমাদের বিস্ময়ের আসল কারণ।
আমার বিস্ময়ের দ্বিতীয় ব্যাপারটি হল, বঙ্গবন্ধুর মত একজন জহুরী লোক কী করে ঐ মুনাফিক লোকটিকে এত দীর্ঘকাল না চিনে আস্থায় রাখলেন? বঙ্গবন্ধু কোন দেবদূত ছিলেন না। তিনি ছিলেন অন্য দশজনের মতই দোষে-গুণে গড়া একজন মাটির মানুষ। তাঁর জীবনেও নিশ্চয়ই অনেক মানবীয় ত্রুটিবিচ্যুতি ছিল ও সীমাবদ্ধতা ছিল; কিন্তু অনেক সংগ্রাম-সাধনা ও ত্যাগ-তীতিক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছেন। আমরা লাভ করেছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, একটি পতাকা, একটি পরিচিতি। তাঁর লোকচেনার ক্ষমতা বিশেষ করে স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। এমন একটি লোককে এমন একটি কপট অবিশ্বাসী লোক কী করে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল নিজেকে বিশ্বাসী ও বিশ্বস্ত বলে পরিচয় দিয়ে? সে যে বিশ্বাসী বা বিশ্বস্ত কোনদিন ছিল না, তা তো আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট। ইসলামের, ইসলামের নবীর বা কুরআনের প্রতি তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস বা ভক্তি শ্রদ্ধা নেই। নেই বঙ্গবন্ধু-পরিবারের প্রতিও বিন্দুমাত্র বিশ্বস্ততা। তাই বঙ্গবন্ধু-দৌহিত্রও তার চক্ষুশূল! একেই বিশ্বাস করে গেলেন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা হাসিনা ওয়াজেদ?
বঙ্গবন্ধুর ইসলামে বিশ্বাস ছিল অকৃত্রিম। আমি যখন বাংলাদেশ আমলের শুরুতেই বাংলাদেশ জমিয়তুল মুদার্রিসীনের প্রথম সভাপতি, বাংলাদেশ সীরাত মজলিসের মহাসচিব এবং আমারই গড়া ইসলামী শিক্ষা সংস্কার সংস্থার সাধারণ সম্পাদকরূপে তাঁর সাথে ঘণিষ্ঠভাবে মেলা-মেশার সুযোগ পেয়েছি। তখন তাঁকে অত্যন্ত নিকট থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। বারবার গণভবনে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছি। ইসলামের শিক্ষা ও কুরআনের আলোকে তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শাদি দিয়েছি। প্রত্যেকটি কথা তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আমার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বায়তুল মুকাররম জাতীয় মসজিদে নবী দিবসের ধর্মীয় মাহফিলে প্রধান অতিথিরূপে এসেছেন। আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে জমিয়তুল মুদার্রিসীনের কনফারেন্সে হাযির হয়েছেন। আমার দাবী মতে বেতার টি.ভি থেকে নির্বাসিত কুরআন তেলাওয়াত চালু করেছেন। সে সময় আমাদের পরামর্শ মতেই তিনি সৌদী সরকারের স্বীকৃতি না দেয়া সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে মক্কায় হাজীভর্তি বিমান পাঠিয়েছেন। বিনা অনুমতিতে জিদ্দায় অবতরণের জন্য ঐ সময় সৌদী সরকার বাংলাদেশ বিমানকে পঁচিশ হাজার ডলার জরিমানাও করেছিল। পরবর্তীতে বিমান কায়রোতে চলে যায় এবং তৎকালীন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতের সুপারিশে হাজীদের হজের ব্যবস্থা হয়। ইসলামিক একাডেমির ছোট পরিসর থেকে আমাদেরই পরামর্শমতে ও শহীদ মওলানা অলিউর রহমানের স্বপ্নের ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্পরূপে ইসলামিক ফাউন্ডেশন গঠিত হয় যার বর্তমান জনবল বিয়াল্লিশ হাজার ও শাখাসংখ্যা চার শতাধিক।
বঙ্গবন্ধু ভারতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লাহোরের ওআইসি কনফারেন্স তথা বিশ্ব মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মেলনে যোগদান করেন। তাবলীগের বিশ্ব ইজতেমার জন্যে জমি বরাদ্দ দেন। ঐ সময় আমি ও আমার ভাই উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী ছাড়া অপর যে মনীষী আলেম বঙ্গবন্ধুর কাছে সম্মান পেতেন তিনি হচ্ছেন কাকরাইল মারকাযের মুরব্বী নোয়াখালীর আমিষাপাড়াবাসী হযরত মওলানা মুনীর আহমদ রহ.। একাধিকবার গণভবনেই ঐ সময় তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছে। তাবলীগের ব্যাপারগুলো নিয়ে প্রধানত তিনিই বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করতেন।
বঙ্গবন্ধু গর্ব করে বলতেন, ‘আমরা মাঝিভাই নৌকার গলুইতে দাঁড়িয়ে, আমার চাষী ভাই জমিনের আইলে দাঁড়িয়ে কাঁদা মাঠে গায়ে গামছা পরে নামায আদায় করে, এটা আমার গর্ব। সেই বঙ্গবন্ধুর পার্শ্বচর হয়ে দীর্ঘকাল রইলো আবদুল লতীফ টাঙ্গাইলীর মত একটা আস্ত মুরতাদ!
সে যে একটা কট্টর মুরতাদ এবং জ্ঞানতই সে তা করেছে তার বড় প্রমাণ হল, গত ১৩ ই অক্টোবরও কোলকাতায় অবতরণ করে সে বলেছে, সে যা বলেছে, তা বুঝে শুনেই বলেছে এবং এজন্য সে মোটেও অনুতপ্ত নয়। এমতাবস্থায় বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দীকি যখন নিজের বউবাচ্চাসহ সংবাদ সম্মেলন করে এ জন্যে পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান, তখন তা বড্ডই বে-মানান, বড্ডই হাস্যকর ঠেকে। একান্ত তাঁরই জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রাযি. এর জ্যেষ্ঠ সন্তান ও উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা রাযি. এর বড়ভাই আবদুর রহমান ইবনে আবূ বকর রাযি. (মৃত্যু ৫৩ হিজরী) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন অনেক; দেরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর। তিনি একদা হযরত আবূবকর রাযি. কে লক্ষ করে বললেন, ‘আব্বাজান! আমি কিন্তু একদা যুদ্ধে (সম্ভবত বদর বা ওহুদ যুদ্ধে) আপনাকে আমার একেবারে তলোয়ারের আওতায়ই পেয়েছিলাম, ইচ্ছে করলেই আপনার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারতাম!’ হযরত আবূবকর রাযি. জবাবে বলেছিলেন, ‘বৎস! আমি যদি তোমাকে এরূপ আওতায় পেতাম, তবে অবশ্যই হত্যা করতাম!’
তাঁর এ বক্তব্যটি ছিল একজন মুসলমানের, একজন সিদ্দীকের বক্তব্য। মুসলমান ইসলামের স্বার্থে জানমাল আওলাদ সবকিছুই ত্যাগ করতে পারে, সবকিছুর মায়া বিসর্জন দিতে পারে! তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا يُؤْمِنُ اَحَدُكُمْ حَتَّى اَكُونَ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ اَجْمَعِينَ
তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার পিতাপুত্র এমনকি দুনিয়ার সকল মানুষ থেকে প্রিয়তর না হবো। বুখারী : ১৪
হযরত উমর রাযি. বদর যুদ্ধের বন্দীদের সম্পর্কে কী করতে হবে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এমন প্রশ্নের উত্তরে নির্দ্বিধায় বলেছিলেন, ওদেরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে হবে। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ শত্রুদের গর্দান নিজেরাই মারবো।
প্রতি রাতে বেতেরের নামাযকালে দুআ কুনুত পড়ে আমরা আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ ব্যক্ত করে বলে থাকি,
وَنَتْرُكُ مَنْ يَّفْجُرُكَ
হে আল্লাহ! তোমার না-ফরমানদেরকে আমরা পরিত্যাগ করি!
এমতাবস্থায় ‘ভাই বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না’ ‘ভাইয়ের সাথে আজীবন শ্রদ্ধার সম্পর্ক থাকবে’ এরূপ বক্তব্য ইসলামের দৃষ্টিতে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া একের অপরাধে অন্যের ক্ষমা চাওয়ার বা শাস্তি পাওয়ার কোন বিধানই ইসলামে নেই। তাই অগ্রজ মুরতাদ হয়ে গেছে বলে যেমন আপনার ব্যক্তিজীবন বা রাজনীতি প্রভাবান্বিত হতে পারে না, তেমনি তার পক্ষ থেকে আপনার ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারটাও অবান্তর ও অগ্রহণযোগ্য- বিশেষত ঐ মুরতাদটি যখন তার পরও দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করছে যে, সে যা বলেছে ঠিকই বলেছে, বুঝেশুনেই বলেছে! এমতাবস্থায় বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দীকিকে একজন মুসলামান হিসাবেই তাঁর কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে! তাঁকে তাঁর বংশের আদি পুরুষের দৃঢ়তার দৃষ্টান্তই অনুসরণ করতে হবে। কেননা, ঈমানের ব্যাপারটাতে আপোস করার বা একজন বেঈমান মুরতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সহযোগিতা সহমর্মিতা প্রকাশ একটি অপরাধ বৈ নয়! ইসলামে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু ইসলামের বিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন ও অবমাননাকর বক্তব্য প্রদান একটি অমার্জনীয় অপরাধ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কটাক্ষমূলক বক্তব্যের জন্যে যেখানে আমাদের অতি উৎসাহী পুলিশ ইন্টারনেট খুঁজে খুঁজে বিরোধীদেরকে গ্রেফতার করে আর বিচারক বা আদালত কারাদণ্ড পর্যন্ত দিয়ে দেয়, সেখানে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের ঈমান-বিশ্বাসের প্রতি জঘন্য মন্তব্যকারীর বিচারটি কীরূপ হওয়া উচিত?
মুরতাদ টাঙ্গাইলী হজ সম্পর্কে যে ইতর ব্যাখ্যা দিয়েছে তা যেমন ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যথার্থ নয় তেমনি তা ইতিহাস সম্পর্কে তার অজ্ঞতারই প্রমাণবহ। পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক লেখকের বইই তার পাঠাগারে থাকওে আল্লাহর কুরআনখানাও সে কোনদিন পড়ে দেখেনি। আর পড়লেও তা বিশ্বাস করেনি। কুরআন শরীফের সূরা হজটি পড়লেই তার চোখ খুলে যেতো। হজ প্রচলিত রয়েছে আদিমানব হযরত আদম আ. এর যুগ থেকেই। জাহিলিয়তযুগের মূর্তিপূজারী আরবরাও হজ পালন করতো। সুতরাং আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্বজাতির অর্থনৈতিক প্রাপ্তির জন্যে হজ চালু করে গেছেন এরূপ বক্তব্য চরম মূর্খতাব্যঞ্জক।
হজ ও তাবলীগী ইজতেমাই আমাদের বিমান ও পর্যটন সংস্থাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এ দু’টি খাতের আয় বাদ দিলে বিমান কর্তৃপক্ষ বা পর্যটন মন্ত্রণালয় মুখ থুবড়ে পড়বে। একটু খোঁজখবর নিয়ে পরিসংখ্যান নিলে আমাদের এ কথার সত্যতা বেরিয়ে আসবে। এ দু’টি খাত না থাকলে আমাদের এ বিমান কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় এর আয় থেকে তাদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতাও চলতে পারবে না। বিষয়টি সকলেরই দৃষ্টি কী করে এড়িয়ে যাচ্ছে আশ্চর্য!
আওয়ামী লীগ সরকার মুরতাদ সিদ্দীকিকে মন্ত্রীসভা ও দলের উচ্চপর্যায়ের কমিটি থেকে বাদ দিলেও তার যথাযথ বিহিত ও শাস্তির ব্যবস্থা না করলে দেশবাসী এটাকে তার জয়বিরোধী মন্তব্য এবং প্রতিমাসে মার্কিনমুল্লুকে বসতরত প্রধানমন্ত্রীপুত্রের এক কোটি ষাট লাখ টাকা বেতন গ্রহণের গোপনীয় তথ্য ফাঁসের অপরাধের শাস্তি বলেই ধারণা করবে। তাই তার যথাযথ শাস্তি বিধান করে সর্বপ্রকার সংশয়-সন্দেহ দূর করাটাই এখন সরকারের দায়িত্ব।
সর্বশেষ একটি কথা না বললেই নয়, আওয়ামী লীগ সরকার চালাচ্ছে, নাকি বি এন পি আমাদের বৃহত্তর আলেম সমাজ বা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মানুষের এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষাব্যবস্থা ও শাসনব্যবস্থাই সামান্য একটু রদবদল করে দেশ চলছে। বাংলাদেশই বলুন আর পাকিস্তানই বলুন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনতার ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে দেশ চলছে না। শাসনক্ষমতা আলেম সমাজ বা ধর্মীয় নেতাদের হাতে নেই, এটাই সত্য কথা। সুতরাং ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা চলবে, এটা অনেকটা অকল্পনীয়। তারপরও কথা আছে। রাষ্ট্রটি কিন্তু সকলের। এ রাষ্ট্রের ইমেজের সাথে আমাদের সকলেরই ভাগ্য জড়িত। দেশের ইমেজ বৃদ্ধিতে বহির্বিশ্বে আমাদের নাগরিকদের মর্যাদা বৃদ্ধি ঘটে, সরকার ইমেজসংকটে পতিত হলে বিশ্বসমাজে আমাদের মর্যাদাহানি ঘটে। বিংশ শতকের মধ্যভাগে যে ভারতবর্ষের বুক চিরে এক ফালি বিভক্ত ভূমি নিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান গড়ে উঠে বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছিল এর মূল কৃতিত্বটি ছিল এই বাঙ্গালী মুসলমানদেরই। পাকিস্তান হয়েছিল বলেই সংখ্যায় সর্ববৃহৎ বা পবিত্রতার দিকে থেকে মক্কামদীনার সমমর্যাদাসম্পন্ন না হলেও বিশ্বে আমাদের স্বীকৃতি ছিল বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্ররূপে। রাজনৈতিক নেতাদের অবিমৃষ্যকারিতা ও দায়িত্ববোধের অভাবে ঐ পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মধ্য থেকেই নতুনভাবে ভাগ্যান্বেষণের উদ্দেশ্যে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করেছি। তারপরও পাকিস্তানের চাইতে আমাদের ধর্মীয় ইমেজ ছিল উন্নততর।
কতিপয় ভ্রষ্ট ব্লগারের ইসলাম বিরোধী প্রচারণা, তার পেছনে আবার রাষ্ট্রীয় ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা, সর্বোপরি শাপলাচত্বরে গভীর নিশীথে লাখ লাখ আলেমের উপর অতি উৎসাহী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জঘন্যতম হামলায় বিশ্বে আমাদের ইসলামী ইমেজ যে কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে’ তা কেবল আরাফাত ফেরত হাজীরাই বলতে পারবেন। এবার আমাদেরই সরকারের ও সরকারী দলের উচ্চ পর্যায়ের একজন মন্ত্রী যখন জঘন্যতম ইসলামদ্রোহী মন্তব্য করেন তখন কেবল তাকে দলচ্যুত বা পদচ্যুত করেই সে ইমেজ উদ্ধার সম্ভব নয়। এ জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বমুসলিমের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা। কেননা, হজ বা তাবলীগের ব্যাপারটি গোটা মুসলিমবিশ্বের ঈমান-বিশ্বাস ও চিন্তাচেতনার সাথে জড়িত। এটা কেবল বাংলাদেশের ব্যাপার নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি পারবেন এ সৎসাহসের পরিচয় দিতে? তা না হলে আল্লাহর দরবারে তো বটেই, আরাফাতের ময়দানেও প্রতিবছর আমাদের হাজীদের মাথা হেট করে থাকতে হবে!
সর্বশেষ সংবাদে জানা যায়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ জনতার অনুভূতির ভাষ্যকার ইসলামী দলসমূহ সম্মিলিতভাবে মুরতাদ আবদুল লতীফ সিদ্দীকিকে দেশে ফিরিয়ে এনে তার উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা দাবি করেছে। অন্যথায় তারা হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচী দিতে বাধ্য হবেন। অপরদিকে আওয়ামী ঘরানা ও সরকারের অন্যতম বলিষ্ঠ ভাষ্যকার সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করলেন- আবদুল লতীফ সিদ্দীকি দেশে ফিরলে সরকার তার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সরকার নীরব সমর্থন জানিয়ে গেলেন! এটা কী এ কথারই স্পষ্ট প্রমাণ নয় যে, সরকার আদৌ তার বিচারে আগ্রহী নন। স্বয়ং আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষ থেকে যেখানে মফস্বল অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে মুরতাদ আবদুল লতীফ সিদ্দীকির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেখানে এ ব্যাপারে সরকারের অনীহা কি তাকে কৌশলে আইনের আওতা থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াস নয়?
আমরা মনে করি, তা আমাদের রাষ্ট্রীয় ইমেজসঙ্কট দূরীকরণের আদৌ সহায়ক হবে না। বিশ্বমুসলিম আমাদেরকে একটি ইসলামবিরোধী শক্তির দাপটের নিচে চাপা পড়া অসহায় মুসলিম জনপদ বলেই মূল্যায়ন করবে। এটা কী মেনে নেয়া যায়?
বঙ্গবন্ধ আমাদের পরামর্শ মতে কাজ করে বাংলাদেশ আমলের শুরুতে আমাদের রাষ্ট্রীয় ইমেজ সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তারপর আমাদেরকে পুরোপুরিই এ সঙ্কট থেকে মুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা কি ঐ উত্তম উদাহরণগুলো অনুসরণ করে আমাদের এ নব্য সঙ্কট থেকে উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন