বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০১৫

সে যুগের দুই গোত্র আর এ যুগের দুই দল (ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলীল)

এক.
দেশটা দিন দিন ফিলিস্তীন হয়ে যাচ্ছে, ইরাক আফগানিস্তান কিংবা লিবিয়া হয়ে যাচ্ছে অথবা ইয়ামান হয়ে যাচ্ছে। এগুলোর চাইতে আরো দুর্দশাগ্রস্ত দেশ থাকলে তাই হতে চলেছে আমাদের দেশ। উল্লিখিত দেশগুলো জবর দখল, বিদেশী হস্তক্ষেপ আর গৃহবিবাদের কারণে প্রায় অস্তিত্ব সঙ্কটের পথে। জবর দখল, বিদেশী হস্তক্ষেপ আর গৃহবিবাদ যাই বলি না কেন সবই মানবসৃষ্ট এবং এগুলোর প্রথম সূচনা হয়েছে দেশীয় মানুষদের হাতে, এরপর হয়তো এর মধ্যে বিদেশী বাকি দেশগুলোর ইন্ধন ছিল, শেষ পর্যন্ত অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে নিজের স্বার্থের অনুকূলে প্রবাহিত করেছে। বণিক দেশগুলোর স্বার্থ বাস্তবায়নে স্থানীয় এজেন্ট আর স্বার্থবাদীরাই অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করেছে। ফিলিস্তীনে যা হচ্ছে এখন এর পূর্ণ দায় পড়ে বৃটেন, আমেরিকা আর জাতিসংঘের উপর। ইরাক আফগানিস্তানের বেলাও তাই। লিবিয়ার বিবাদে ফ্রান্সের ইন্ধন জোগানোর বিষয়টি অনেক স্পষ্ট, ইয়ামানের সঙ্কটের দায় প্রায় পুরোটাই পড়ে ইরানের উপর। এসব দেশের অপরাধ চিহ্নিত করার আগে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাব সমস্যার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটছে দেশীয়দেরই হাতেই, নিজেরা কোন্দলে লিপ্ত হয়ে বিদেশীদের ডেকে আনছে, এই সুযোগে বিদেশীরা রীতিমত দেন-দরবার করে যাকে দিয়ে অধিক মুনাফা লাভ করা যাবে তাকে সমর্থন দিচ্ছে। এরপর চলতে থাকে অন্তহীন দ্বন্দ আর দ্বন্দ্ব। সব সঙ্কটের দায় যে প্রথম দেশীয়দের উপর পড়ে এর পক্ষে কোরআন শরীফের আয়াত থেকেও বুঝা যায়। আল্লাহ তাআালা বলেন-
اِنَّ اللهَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوْا مَابِاَنْفُسِهِمْ
নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা কোন ব্যক্তি বা জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে পরিবর্তন আনেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভেতর পরিবর্তন আনে। সূরা রা’দ : ১১
এই হল কোরআনের বাণী, এই হল বাস্তবতা।
দুই.
আজ কতদিন হল সঙ্কটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ। কোন দিন দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ ছিল তাই এখন আর মনে পড়ে না। গাড়ীতে আগুন জ্বলবে, পেট্রোল বোমা পড়বে, নিরাপরাধ মানুষ পুড়ে মরবে, দিনের পর দিন গৃহবন্দি হয়ে থাকতে হবে- এটাই হয়ে গেছে এখন স্বাভাবিক। আগে গাড়ী পুড়লে, পেট্রোল বোমা পড়লে, নিরপরাধ মানুষ নিহত হলে সংবাদ হতো, এখন সংবাদ হয় কোন দিন গাড়ী না পুড়লে, কোথাও পেট্রোল বোমা না পড়লে, মানুষ মারা না গেলে। পরিস্থিতি যে কত ভয়ানক রূপ ধারণ করছে তা আঁচ করার ক্ষমতাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। ক্ষমতাসীনরা সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধী দলকে নিঃশেষ করে দিতে চাচ্ছে। বিরোধীদল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যা যা প্রয়োজন মনে করছে তাই করছে। কখনো ধরনা দিচ্ছে আমেরিকার কাছে, কখনো ব্রিটেনের কাছে, কখনো জাতিসংঘের কাছে, ভারতবিরোধী ইমেজের অধিকারী দলটি ভারতের বন্ধুত্ব লাভের আশায় মাথা ঠুকে ঠুকে মরছে। তাদের জনপ্রিয়তা যে ভারতবিরোধীতার কারণে তৈরী হয়েছে তাই তারা ভুলতে বসেছে। এক সময় তারা অভিযোগ করেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বিদেশী প্রভুর সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছে কিন্তু এ সবই এখন অতীত। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে সেই একই অভিযোগ যে অভিযোগ তারা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে করত, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও বর্তমানে সেই একই অভিযোগ যা তারা অতীতে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে করত। গত ২৪ বছর ধরে একই নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে বাংলাদেশে। পরিবর্তন হয়েছে শুধু নায়ক আর খল নায়কের।
তিন.
গলদ আমাদের কোথায়? সঙ্কটময় এ সময়ে গলদ নির্ণয়ে এতোটা ঝুঁকি নেই। তাই বলছি গলদ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনই আমাদের সবচেয়ে বড় গলদ, সবচেয়ে বড় ভুল। গত ৪২ বছর ধরেই আমরা এই গলদের উপর আছি, এই গলদ চর্চা করে আসছি। তাই আমরাও দিন দিন দুর্দশার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। এই সময়ে এ গলদ নির্ণয়ে ঝুঁকি নেই এজন্য- আমাদের দেশের গণতন্ত্রের পূজারী বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক ও রাজনীতিকরা বুঝতে শুরু করেছে গণতন্ত্র হল সবচাইতে জঘন্য শাসনব্যবস্থা। কিন্তু তাদের একথা বুঝেও লাভ নেই কারণ, তারা এ কথাও বলছে, জঘন্য হলেও গণতন্ত্রের চাইতে ভালো বিকল্প কোন শাসনব্যবস্থা নেই। আসলে সমাজের বিবেক বলে পরিচিত এসব লোকের এক চোখ খুলেছে আরেক চোখ খোলেনি অথবা ইচ্ছে করেই আরেক চোখ বন্ধ রেখেছে। আরেক চোখ খুললেই তারা দেখতে পেত শুধু গণতন্ত্র নয় পৃথিবীর সব তন্ত্র মন্ত্র আর শাসনব্যবস্থার বিকল্প একটিই। আর তা হল ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ইসলামী শাসনব্যবস্থা। এই সময়ে বিস্তারিত পর্যালোচনায় না গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক দিক লক্ষ করলেই আমরা বর্তমান সঙ্কটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ পেয়ে যাব। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিরোধী দলের ধারণাই নেই। ইসলামী রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্র প্রধান খলীফার হাতে আনুগত্যের শপথ করবে। আরবীতে যাকে বলে বাইয়াত। ইসলামে এ বাইয়াত গ্রহণ ওয়াজিব। বাইয়াত না হয়ে কেউ থাকতে পারবে না। বাইয়াতের পর খলীফা দেশের বিশিষ্টজন যাদেরকে উলূল আমর বলা হয় তাদের পরামর্শক্রমে দেশ পরিচালনা করবেন। ভোগ-বিলাস, জুলুম, নির্যাতন ও স্বেচ্ছারিতা কিছুই থাকতে পারবে না। এর বিপরীতে আমরা গণতন্ত্রকে দেখতে পাই যে, এ ব্যবস্থায় বিরোধীদল না থাকলে গণতন্ত্রই চর্চা হয় না। রাষ্ট্রপ্রধান যদি জনগণের হিতাকাক্সক্ষী হয়, সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের কল্যাণে কাজ করে তাহলে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে হবে কেন?
চার
আমরা বিএনপিই করি বা আওয়ামী লীগ করি আমাদের কিন্তু আরেকটি পরিচয় আছে। পরিচয়টি হল, আমরা মুসলমান। এ পরিচয় আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে পরিচিত করে। এ পরিচয় আমাদেরকে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে এক দেহ এক প্রাণ হতে শেখায়। যে পরিচয়ে আনন্দ-বেদনা সমানভাবে ভাগ হয়। হাদীস শরীফে রাসূলুল্লাহ বলেন- মুসলমান যেন একদেহ, চোখ রোগাক্রান্ত হলে সারাদেহ ব্যাথা অনুভব করে, মাথা ব্যাথা হলে সাড়া দেহই ব্যাথা করে। হাদীসের এ পরিচয়ে নিজেদেরকে পরিচিত করে তুলতে পারিনি বলেই আজ আমাদের দুর্গতি। যেখানে এক ভাই আঘাত পেলে উপশম করার জন্য আরেক ভাই ছুটে আসার কথা সেখানে এক ভাইই আরেক ভাইকে পুড়িয়ে মারছি। সন্দেহের বশীভূত হয়ে বিনা বিচারে হত্যা করছি কিংবা ট্রাক চাপা দিচ্ছি অথবা পঙ্গু করে ছাড়ছি।
দীর্ঘ দিন ধরেই আমাদের অধিকাংশ বিবাদ বিসংবাদ দুইটি দলকে কেন্দ্র করেই। এই দুই দলের কর্ণধাররা যদি দায়িত্বশীল হয়ে নিজেদের নেতা-কর্মীদের পরিচর্যা ও নিয়ন্ত্রণ করতেন তাহলে এদেশে এতো প্রাণহানী এতো আশান্তির সৃষ্টি হত না। সন্তানহারা মা-বাবা, স্বামীহারা স্ত্রী আর বাবাহারা ছেলে-মেয়ের আর্তনাদে বাংলার বাতাস এতো বিষিয়ে উঠতো না। এ কর্মীরাই কিয়ামতের দিন নেতাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ করে বলবে, হে প্রতিপালক! আমরা আমাদের এসব নেতাদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত হয়েছি তাই আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ আযাব দিন, তাদেরকে কঠোর অভিশাপ দিন।
তারা নিজেরাই আফসোস করে বলবে, আহ! যদি অমুক মানুষটাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। সেই তো আমাকে আল্লাহর বিধান থেকে বিভ্রান্ত করেছে।
আমাদের মসজিদের মিম্বারগুলো দ্বীন প্রচারের বড় একটি মাধ্যম। এ মিম্বরের প্রভাব পরিলক্ষিত সমাজের প্রায় সর্বস্তরে। একবার এমনই এক মিম্বরে এক খতীব সাহেবকে মুসল্লীদের সম্বোধন করে বলতে শুনেছি, ‘আল্লাহ যে একজন আছেন তাই আমরা ভুলতে বসেছি। নামাযে এসে আমরা যে কার এবাদত করি তাই মন থেকে সরিয়ে ফেলেছি। আমরা আজ আল্লাহকে পরিহার করে দু’জন প্রভু গ্রহণ করেছি। একটি বিএনপি আরেকটি আওয়ামী লীগ। আমরা এখন আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের বানানো এ দুই খোদারই পূজা-অর্চনা করছি।’
খতীব সাহেবের বক্তব্যটা সত্যিই অনেক তিক্ত। গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার মত। কিন্তু বাস্তবতা যে খতীব সাহেবের কাছে এমনই ধরা দিয়েছে। এত তিক্ত কথা লেখার মত সাহস আমার কখনই নেই। কিন্তু এই ক’দিনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ করে এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলেই মনে হচ্ছে এরা বিষয়টি উপলদ্ধি করতে পারছে। তাই অনেকদিন আগে শোনা খতীব সাহেবের বক্তব্যটি পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম।
প্রবন্ধ শেষ করব মিশরের কবি হিশাম আল-জাখ এর একটি কবিতা দিয়ে। তার আগে খুব ছোট্ট একটি ভূমিকা, ইসলামপূর্বে মদীনায় দুটি গোত্র ছিল, আউস আর খায়রাজ। এ দুই গোত্রের মাঝে ছিল চরম শত্রুতা তাদের যুদ্ধ চলছিল যুগের পর যুগ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলেছে তাদের যুদ্ধ। ইসলাম গ্রহণের পর, মদীনায় রাসূল আগমনের পর তারা ভাই ভাই হয়ে গেল, পরস্পরে হানাহানি ছেড়ে দিল। ইসলাম ও মুসলমানের সেবায় অভূতপূর্ব সাড়া দেয়ায় তাদের নাম হয় আনসার। কবি হিশাম আল জাখ বলেন-
هجرنا ديننا عمدا فصرنا الأوس والخزرج
نولي جهلنا فينا وننتظر الغبا مخرج
আমরা এখন জেনে বুঝে আমাদের ধর্ম ছেড়ে দিয়েছি, আমরা আউস ও খায়রাজ গোত্রে পরিণত হয়ে গেছি।
মূর্খতাকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে নির্বোধের মত মুক্তির উপায় খুঁজে বেড়াচ্ছি।
কবি আরব সমাজকে লক্ষ করে বললেও এ কবিতা আমাদের জন্য সমানভাবে সত্য। আমরা মুসলমান হয়ে পরস্পর আনসার না হয়ে আমরা হয়ে গেছি আউস আর খায়রাজ গোত্র। আমরা আনসারদের গুণাগুণ অর্জন না করতে পারলে আউস আর খায়রাজই রয়ে যাব। দুর্ভোগ পোহাতেই থাকব, মুক্তি মিলবে না কোন দিনই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন