বুধবার, ৮ জুলাই, ২০১৫

ওহী’র সংবাদ : ওরা জান্নাতী . হযরত উমর রা.

প্রিয় সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সত্য বলেছেন। হযরত উমরের ইসলাম গ্রহণ দাওয়াতের ময়দানে এনে দিয়েছিলো এক বৈপ্লবিক সূচনা। ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর বয়স ছিলো সাতাশ। নবুওতের ষষ্ঠ বছরে তিনি ইসলাম কবুল করে ধন্য হয়েছিলেন। এর তিনদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মহাবীর হামজা। তখন মুসলমানদের সংখ্যা ছিলো ৩৯ জন। হযরত উমরকে দিয়ে এ সংখ্যা পৌঁছে গেলো ৪০ এর কোঠায়। এর আগে তো মুসলমানরা লুকিয়ে-লুকিয়ে পাহাড়ের ঘাটিতে নামাজ পড়তেন। কিন্তু হযরত উমরের ইসলাম গ্রহণের পর দৃশ্যপট একেবারেই বদলে গেলো। দারুল আরকাম-এর ক্ষুদ্র সীমানা পেরিয়ে ইসলাম এখন বাইরে।
ইসলামের যাত্রা এখন গোপন থেকে প্রকাশ্যে।
পাহাড়ের ঘাটি থেকে কা‘বা-চত্বরে।
দুর্বল অবস্থা থেকে সবল অবস্থায়।
আম্মার বেলাল-এর পাশে এসে এখন দাঁড়িয়েছেন হামযা ও উমরও।
কাফের মুশরিক মুনাফিকরা আসলে কাপুরুষ। সব সময়ের সব যুগের কাপুরুষ। মুখে যতোই তারা বীরত্ব প্রকাশ করুক আসলে তারা চিরকাপুরুষ। রণক্ষেত্রে এরাই সবচে’ বেশি ভীরু। অথচ বীরের জাতি মুসলিম সম্প্রদায় এদের ভয়ে নিজেদের ‘বীরপরিচয়’ প্রকাশ করতে ভয় পায়। সত্যি দুর্ভাগ্যের বিষয়। বীরত্ব যাদের রক্ত-মাংস-হাড্ডি-মেশা, তারাই আজ সেই সব কাপুরুষ দুশমনের সামনে বীরত্ব বিকিয়ে দেওলিয়া হয়ে বসে আছে— শুধুই একটুখানি স্বার্থের জন্যে। এই-যে সাহস করে হযরত উমর ও হযরত হামজা সবাইকে নিয়ে প্রকাশ্য মিছিল বের করেছেন, কই কাফের মুশরিকরা তো একটু চোখ রাঙাতেও সাহস পেলো না! আমাদের মাঝে কি এখন নেই কোনো বীর উমর ও বীর হামজা?
চৌদ্দ.
উমরের মনে এখন ইসলামের নবীর প্রতি দ্রোহমাখা সেই বিদ্বেষ নেই—
আছে শুধু ভালোবাসা। ইসলামের জন্যে সব বিলিয়ে দেয়ার দুর্বার বাসনা।
উমরের তলোয়ার আর কখনো ইসলামের বিপক্ষে .. ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে ঝলসে ওঠবে না।
এ তলোয়ার এখন অপেক্ষায় আছে বদরের ওহুদের খন্দকের!
সেইসব রক্তঝরা— ত্যাগময় দিন কি খুব বেশি দূরে?
না! ঐ তো নববী নির্দেশ এসে গেছে যেতে হবে সবাইকে এখন মদীনায়! হাবশায় যারা হিজরত করে গিয়েছিলো দু’ দু’ বারে, তারাও এখন হবে মদীনামুখী!
উমর দেখেন প্রতিদিন দলে দলে সাহাবীরা চলে যাচ্ছে মদীনায়। প্রিয় মক্কার মায়া পেছনে ফেলে। শুধু ঈমানের মায়া বুকে নিয়ে। উমরের মনটা একদিকে বিষণ্নতায় ছেয়ে যায় আরেকদিকে একটা স্থির সংকল্পে জ্বলে ওঠে।
কেনো এই বিষণ্নতা?
শৈশব-কৈাশেরর স্মৃতিকে বিদায় জানাতে হচ্ছে। ধন-সম্পদও সব ছেড়ে যেতে হচ্ছে। সঙ্গে করেও ওরা কিছু নিয়ে যেতে দিচ্ছে না। অসহায় দুর্বলদের প্রতি নিত্য বেড়ে চলেছে কাফের মুশরিকদের জুলুম নির্যাতন।
কিসের এই সংকল্প?
কাফের মুশরিকদের এতো ভয় পেতে হবে কেনো?
কেনো গোপনে গোপনে হিজরত করতে হবে?
মক্কা কি আমাদের না, শুধুই ওদের?
কেনো রাতের আঁধারে তবে মক্কা ছেড়ে হিজরত করতে হবে?
না! উমর মানেন না এ সব!
উমর সিদ্ধান্ত নিলেন হিজরত করবেন সূর্যের আলোয়!
সবার চোখের সামনে!
সবার চেখে চোখ রেখে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে!
পনেরো.
প্রকাশ্য হিজরতের উদ্দেশে রণ-সাজে সজ্জিত হলেন তিনি। একপাশে রাখলেন ধারালো তরবারি আরেক হাতে ধনুক। এক হাতের মুঠোয় রাখলেন কিছু তীর আরেক হাতে ধরলেন অগ্রভাগে তীক্ষèধার লোহা-বসানো লাঠি। তারপর বীরোচিত পদক্ষেপে উপস্থিত হলেন কা‘বা-চত্বরে। সাতবার তাওয়াফ করলেন। মাক্বামে ইবরাহীমে প্রাণভরে সালাত আদায় করলেন। তারপর সমবেত কুরাইশের সামনে দাঁড়িয়ে তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন—
شاهت الوجوه! لا يُرْغِمُ الله إلا هذه المَعاطِسَ (الأنوف)، مَنْ أراد أنْ يُثْكِلَ أمَّه أوْ يُوْتِمَ وَلَدَه أوْ يُرْمِلَ زَوْجَتَه، فَلْيَلْقَنِي وراء هذا الوادي!
‘কালি পড়–ক ওদের মুখে! মায়ের বুক খালি করার, কারো সন্তান এতিম করার এবং স্ত্রীকে বিধবা বানাবার ‘সাধ’ থাকলে সে যেনো ঐ উপত্যকার আড়ালে আমার মুখোমুখি হয়!’
ষোলো.
এ পর্যন্ত অনেক সাহাবী মদীনায় হিজরত করেছেন। সবাই গোপনে করেছেন। সামনে আরো যারা করবেন তারাও গোপনেই করবেন। এমন কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকরও হিজরত করবেন গোপনে রাতের আঁধারে। মাঝখানে লুকিয়ে থাকতে হবে গারে সাওরে তিনদিন। তারপর অনেকটা নিরাপদ প্রহরে প্রায় ঝিমিয়ে-পড়া খোঁজাখুঁজিতে পিছু-ধাওয়ার আশঙ্কা বুকে নিয়ে বের হবেন মদীনার পথে। কিন্তু উমর! তিনি কেনো অমন বুক ফুলিয়ে সবাইকে জানিয়ে এবং রণহুঙ্কার ছেড়ে এভাবে হিজরত করলেন?! এর উত্তর জানতে চলো যাই আলী তানতাভীর কাছে!
তাঁর ভাষায়—
‘হয়তো কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগছে— কী ব্যাপার! রাসূল এবং সিদ্দীকে আকবারসহ সকল সাহাবীই যেখানে হিজরত করেছেন গোপনে, সেখানে হযরত উমর হিজরত করলেন প্রকাশ্যে এবং সোচ্চার (বীরোচিত—বীরের মতন) ঘোষণা দিয়ে! তাহলে কি হযরত উমর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর রা.-এর চেয়েও সাহসী ছিলেন?! আল্লাহর কসম! বিষয়টি এমন না! হযরত উমর নয়—তাঁরাই ছিলেন বেশি সাহসী! ইতিহাস তাই বলে। ইতিহাসের কোনো কোনো ঘটনার দিকে তাকালেই আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে উমর ছিলেন তাঁদের তুলনায় অনেক কম সাহসী। সামনের চিত্রগুলোর দিকে লক্ষ্য করো—
চিত্র-১ :
দারুল আরকাম-এর কথা তোমাদের মনে আছে? একটু শুরু থেকে আমিই বলি! নবীজীকে ‘শেষ’ করে দেবেন বলে উমর ছুটে গিয়েছিলেন নাঙা তলোয়ার হাতে! পথে হোঁচট খেয়ে রাস্তা বদলে ছুটে গেলেন ফাতেমার গৃহে ‘নিজের আপদ’ আগে দূর করতে! কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রথমে ক্ষেপা-আক্রমণে ভগ্নিপতি সাঈদকে ধরাশায়ী এবং বোন ফাতেমাকে রক্তাক্ত করলেও একটু পরই তাঁর ভিতরে আগে থেকেই ‘গোপনে-গোপনে প্রবেশ-করা ইসলাম’ জেগে-জেগে উঠতে লাগলো! তারপর সূরা ত্বোয়া-হা’র আলো পেয়ে তা আরো আলোকিত হয়ে উঠলো! তারপর? তারপর উমর আগের মতোই আবারো ছুটে যেতে লাগলেন দারুল আরকাম অভিমুখে! গেলেন! দরোজায় কড়া নাড়লেন! দরোজায় এসে এক সাহাবী উমরকে দেখে ভয়-কাতর কণ্ঠে সবাইকে গিয়ে খবর দিলেন— উমর! হাতে নাঙা তলোয়ার! হামজা এসে দরোজা খুলে লালচোখে উমরকে ঢুকতে দিলেন! উমর আল্লাহর রাসূলের কাছে যেতেই তিনি তার তরবারীর এক অংশ এবং জামার এক অংশ চেপে ধরলেন! ধরতেই উমর ভয়ে কাঁপতে লাগলেন! কে তাহলে বেশি সাহসী?
চিত্র-২ :
বিভিন্ন জিহাদের ময়দানে যুদ্ধ যখন তুমূল আকার ধারণ করতো তখন সাহাবীরা —যাদের ভিতরে খোদ উমরও শামিল থাকতেন— ভয়ে আল্লাহর রাসূলের পাশে এসে জড়ো হতেন! আল্লাহর নবীর বীরত্ব ও সাহসিকতার সামনে তখন হ্বান হয়ে যেতো তাদের বীরত্ব ও সাহসিকতা!
চিত্র-৩ :
রাসূলের ওফাতের পর পরিস্থিতি ভীষণ প্রতিকূল হয়ে উঠেছিলো। দলে-দলে মানুষ মুরতাদ হতে লাগলো। অনেকে যাকাত দিতে অস্বীকার করলো। ইসলামের বিরুদ্ধে দুশমন একজোট হয়ে ময়দানে নেমে এসেছিলো। তখন হযরত উমরসহ অনেকেই বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। অনেকের ন্যায় হযরত উমরও যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে খলীফা আবু বকরকে একটু নমনীয় হতে বলেছিলেন। কিন্তু সিদ্দীকে আকবার সেদিন উমরকে কঠিন কণ্ঠে ‘না!’ বলে দিয়ে পাহাড়ের মতো অবিচল থেকে পরিস্থিতি মুকাবিলা করেছিলেন! এক পর্যায়ে তিনি উমরকে লক্ষ করে বলেছিলেন-
أجَبار في الجاهِلِيَّةِ خَوَّارٌ في الإسلام
জাহেলী যুগের বীরপুরুষ ইসলামের যুগে এসে অমন কাপুরুষ!
এ তিনটি চিত্রে আমরা কী দেখলাম! উমর নয়— তাঁরাই ছিলেন বেশি সাহসী! এবার আসা যাক তবুও কেনো উমর হিজরত করেছেন প্রকাশ্যে আর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আবু বকর রা.সহ অন্য সবাই সংগোপনে! আছে কি কোনো হিকমত ও রহস্য?
হ্যাঁ .. বিষয়টি আসলেই হিকমত ও রহস্যপূর্ণ। (বীরত্ব ও কাপুরুষতার অনেক ঊর্ধ্বে যার অবস্থান।) আসল কথা হলো; প্রধান সিপাহসালার যখন এক রণাঙ্গন থেকে আরেক রণাঙ্গনে যেতে চান এবং পথ থাকে শত্রুঘেরা ও বিপদসঙ্কুল, তখন পথিমধ্যে তিনি মোটেই শত্রুর পিছু নেন না এবং কোনো রকম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন না। ঘটনাক্রমে দুশমন সামনে পড়ে গেলেও অতি সতর্কতায় শত্রুকে এড়িয়ে যান তিনি। কেননা তিনি যদি তখন যুদ্ধের পথ বেছে নেন এবং কোনো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যান তাহলে নির্ঘাৎ ব্যর্থ হয়ে যাবে সেই সৈনিকদের মিশন, যারা তাঁর অপেক্ষায় অধীর হয়ে প্রহর গোনছে এবং তাঁর অনুপস্থিতি যাদের মাঝে সৃষ্টি করবে অপূরণীয় শূন্যতা। তাই যুদ্ধের দিকে পা না-বাড়িয়ে সন্তর্পণে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়াই প্রাজ্ঞোচিত সিদ্ধান্ত হবে। এ জন্যে মোটেই তাঁকে কম সাহসী বা কাপুরুষ বলা যাবে না।
অনুরূপভাবে আমাদের নবীজী ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সমরকুশলী—সবচে’ বিজ্ঞ সেনাপতি। তাঁর যুদ্ধক্ষেত্র বিশাল-বিস্তৃত। কুরাইশ এবং কাবিলায়ে হাওয়াযিন-এর ক্ষুদ্র গণ্ডিতে তা সীমাবদ্ধ ছিলো না। শিরক, বর্বরতা, জুলুম-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে ছিলো তাঁর সংগ্রাম। স্থান-কাল-পাত্র-এর গণ্ডি থেকে তা অনেক ঊর্ধে। তাই যুগে যুগে যারা হকের পথে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবে তারাই হবে মুহাম্মদী কাফেলার বীর সৈনিক।
সুতরাং যে-রাসূলের রণক্ষেত্র এতো বিশাল-বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী, কুরাইশের একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর উপর বিজয়ী হওয়ার জন্যে আগামী দিনের বিশাল রণক্ষেত্রকে তিনি ভুলে যেতে পারেন না। বৃহত্তম লক্ষ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে হিজরত করতে পারেন না! এটিই ছিলো আকাশের চাওয়া! আল্লাহর মর্জি!’ (কিসসাতু হায়াতি উমার)   

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন