সোমবার, ৬ জুলাই, ২০১৫

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (দাঃবাঃ) মাহবুব অপু ((ইসলামি কলাম )


প্রতি বছরের ন্যায় আবার আমাদের মাঝে উপস্থিত হল পবিত্র রমজান মাসের ১৯ তারিখ। আজ থেকে তিন বছর পূর্বে এই দিন বাংলার মুসলমানদেরকে দিশেহারা অবস্থায় রেখে এমন একজন পথপ্রদর্শক দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন, যাঁর অনুপস্থিতি আজও এই দেশের মুসলমানগন তীলে তীলে উপলব্ধি করছে।
তিনি ছিলন মুজাহিদে আজম হযরত শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ) এর হাতে গড়া সুযোগ্য উত্তরসূরি, শাইখুল ইসলাম হযরত জাফর আহমেদ উসমানী (রহঃ) শিক্ষকতা জীবনের সর্বশেষ বছর তাঁকে ছাত্র হিসেবে পেয়ে অত্যন্ত প্রফুল্লতার সাথে বুখারী শরীফের পাঠদান করেছেন, কুতুবে আলম হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহঃ) তাঁকে "শেরে বাংলা" উপাধিতে সম্বোধন করেছেন এবং বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ শাইখুল হাদিস বললে এক বাক্যে এই মহান ব্যক্তিকেই স্মরণ করে।
তিনিই হচ্ছেন হযরত শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহঃ)। উপমহাদেশের ইলমী অঙ্গন থেকে শুরু করে রাজনীতির ময়দান পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রেই একজন সুদক্ষ কান্ডারির বেশে তিনি জাতিকে পথপ্রদর্শন করেছেন। বাবরী মসজিদ শহিদ করার পর তিনিই একমাত্র সর্বস্তরের জনগনকে সাথে নিয়ে অযোদ্ধা অভিমুখে লংমার্চের ডাক দিয়েছিলেন। ফতোয়া বিরোধী আন্দলনে তাঁর ভূমিকা ছিল ওলামায়ে কেরামের প্রথম সারিতে। খতমে নবুওত আন্দলনের মহা-সমাবেশে বাধা দেয়া হলে তিনি ব্যাঘ্র কন্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন "লাশের মঞ্চের উপর দাঁড়িয়েও যদি আমাকে বক্তৃতা দিতে হয়, তাহলেও আমি আজিজুল হক এই সমাবেশে বক্তৃতা করবো" এবং হাজারো বাধা ডিঙিয়ে বক্তৃতা করে দেখিয়েছেনও।
রাজনীতির ময়দানে তিনি যেমনি ভাবে ছিলেন একজন আপোসহীন নির্ভীক সিপাহসালার ঠিক তেমনি ভাবে ইলমী অঙ্গনেও তাঁর অবধান ছিল অপরিসীম।
তিনিই সর্বপ্রথম বুখারী শরীফের বাংলা অনুবাদ করেন এবং অর্ধশতাব্দিরও অধিক কাল পর্যন্ত একাধিক মাদ্রাসায় তিনি বুখারী শরীফের পাঠদান করেন। যার মাঝে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া, জামিয়া শারিইয়্যাহ মালিবাগ, সিরাজগঞ্জের মিতুয়া মাদ্রাসা, জামিউল উলুম মিরপুর মাদ্রাসা সমূহ অন্যতম। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে অধ্যয়নরত অবস্থায় হযরত জাফর আহমেদ উসমানী (রহঃ) বুখারী শরীফের যেই তাকরীর (ব্যাখ্যা-বিশ্লেষন) করতেন তা এত নির্ভুল ভাবে নোট করেছেন যে, পরবর্তিতে উহাই বুখারী শরীফের শরাহ হিসেবে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থের রূপ নেয়। (নামটি সঠিক স্মরনে নেই বিধায় উল্লেখ করতে না পারার কারনে দুঃখিত)।
পারিবারিক ভাবেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত আদর্শবান একজন পরিচালক। তাঁর পরিবারে রয়েছে শতাধিক কুরআনের হাফেজ। অনেক আগে তাঁরই পরিবারের এক সদস্যের মুখ থেকে শুনেছিলাম, তিনি তাঁর পরিবারের সকল সদস্যকে একত্রিত করে ওসিয়ত করেছিলেন (যাদের মাঝে তাঁর ছেলে, মেয়ে, নাতি, পুতি সকলেই উপস্থিত ছিলেন) তারা যেন বংশ পরম্পরায় সকলকেই কুরআনের হাফেজ বানায় এবং পরবর্তি বংশধরদেরকে হাফেজ বানানের ওসিয়ত করে যায়।
তিনি এমনই একজন ব্যক্তি ছিলেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন পর্যন্ত রেখে গিয়েছিলেন অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি যদিও আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর মুখনিঃসৃত কথা গুলো আজও সারা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের পথ চলতে সাহায্য করে।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তা'আলার দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন হযরতের অবর্তমানে আমাদেরকেই তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে কবুল করেন এবং তাঁর শূন্যতার অভাব কিছুটা হলেও পূরণ করার তৌফিক দান করেন। আমীন!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন