বুধবার, ৮ জুলাই, ২০১৫

রমজান ও নবীজীঃ (ইসলামি কলাম)

রমজান ও নবীজীঃ
আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন- রমজানে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবাদতের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দিতেন। হযরত জিবরিল আমীন নবীজীর সাথে কুরআনের 'দাওর' করতেন। তাঁরা পরস্পর পরস্পরকে কুরআন শোনাতেন। রমজানে নবীজী খুব বেশী দান করতেন- মুক্ত প্রবাহমান বাতাসের মতো। অর্থাৎ তখন নবীজীর দানের কোনো বাঁধ থাকতো না, সীমা থাকতো না। মুক্ত প্রবাহমান বাতাসের মতোই মুক্ত হস্তে তিনি দান করতেন। হাদীসে এসেছে-
وكان أجود الناس ، وأجود ما يكون في رمضان
'তিনি ছিলেন সবার চেয়ে বড় দানশীল। আর রমজানে আরো বড় দানশীল।'
রমজানে নবীজীর ইবাদত যেমন বৃদ্ধি পেতো তেমনি তাঁর দান-দক্ষিণাও বেড়ে যেতো। তাঁর রমজান ছিলো সালাত সিয়াম কিয়াম তিলাওয়াত ই'তিকাফ ও দানের এক বর্ণাঢ্য রূপ। অন্য মাসের তুলনায় অনেক বেড়ে যেতো এ-সকল ইবাদতের পরিমাণ। আর তা চলতে থাকতো অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতায়। দিন আর রাত তাঁর কাছে একাকার হয়ে যেতো। অবশ্য সাহাবায়ে কেরামকে তিনি তাঁর মতো ধারাবাহিকতা অনুসরণের অনুমতি দিতেন না। তারপরও সাহাবীরা ব্যাকুলতা প্রকাশ করলে তিনি বলতেন-
لستُ كهيئتكم ، إني أبيت عند ربي يُطعمني ويسقيني
'আমি তো তোমাদের মতো নই। আমি তো আমার রব-এর কাছে রাত কাটাই (তাঁর ইবাদত-বন্দেগিতে মিশে যাই), তিনিই আমাকে পানাহার করান।'
এ পানাহারের অর্থ মোটেই উদরপুর্তি নয়। এ পানাহারের অর্থ হলো- রব-এর সাথে তাঁর রমজানিক ঘনিষ্ঠতার বর্ণিল বিবরণ। হাবীব-মাহবুবের নিগূঢ়তম প্রেম-রহস্যের শব্দধ্বনি। কিংবা সাগরতটের গতিময় তরঙ্গোচ্ছ্বাস।
মা'বুদকে দেখে যখন চোখ জোড়ায়,
মাকসুদকে অনুভব করে যখন হৃদয় জোড়ায়,
মাওলার যিকিরে যখন অন্তর বসন্ত-সজিবতায় ছেয়ে যায়,
প্রেমময়ের সান্নিধ্য-পরশের নিবিড়তায় স্বত্ত্বা যখন বিলীন হয়ে যায়-
তখন কি আর মনে থাকে দুনিয়ার এইসব খাবার-দাবার?
তখন এই বাহ্যিক খাবারের পরিবর্তে ঐ আত্মিক খাবারই হয়ে যায় তাঁর খোরাক! 'তিনিই আমাকে পানাহার করান।'- এর এই হলো অর্থ ও মর্ম। এক আরব কবিও 'এ সুরেই গান গাইছেন'-
فزادُ الرُّوح أرواحُ المعاني
وليس بأن طعمت ولا شربتا
فليس يُضيرك الإفتارُ شيئاً
إذا ما أنت ربك قد عرفتا
'আত্মার খাদ্য বোঝো না? সে হলো- আধ্যাত্মিকতার প্রাণময়তা!
থালা-থালা খাবার নয়, সুরাহি-ভরা পানিও নয়!
না! দারিদ্র তোমায় ক্ষতি করতে পারবে না, একদম না!
যদি রব-এর সাথে হয় তোমার 'রুদ্ধদ্বার' ঘনিষ্ঠতা!
হ্যাঁ, রমজান মাসে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ যিকিরকারী। শ্রেষ্ঠ ইবাদতগুজার। রমজান মানেই তাঁর কাছে- ইবাদতের মওসুম। তিলাওয়াতের মওসুম। যিকিরের মওসুম। তখন মুনাজাতে মুনাজাতে কেটে যেতো শেষ রাতের নির্জন প্রহর। সালাতে দাঁড়ালে ভুলে যেতেন তিনি পারিপার্শ্বিকতা। দীর্ঘ তিলাওয়াতে ফুলে যেতো পবিত্র তাঁর পদযুগল। রুকুতে গেলে মনে হতো- আর কি সোজা হবেন না! সেজদায় গেলে মনে হতো- আর কি মাথা ওঠাবেন না! তাহাজ্জুদের মুসাল্লা বড়ো প্রিয় ছিলো তাঁর। তখন তিনি ঘুমিয়ে থাকতে পারতেন না। আল্লাহ্‌র তাঁকে ঘুমিয়ে থাকতে দিতেন না! তাঁর বাণীর মিষ্টি পরশে জাগিয়ে দিতেন!!
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ، قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلاً
'হে কম্বল-আবৃত! রাত জেগে ইবাদত করো, অল্প সময় ব্যতিত।'
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَاماً مَحْمُوداً
'রাতের একটা অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো। তোমার জন্যে এ একটি অতিরিক্ত আমল। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে অধিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।'
এই তো হলো রাতে নবীজীর আমলের সামান্য ঝলকের কথা। দিন কীভাবে কাটতো তাঁর? কখনো দাওয়াতের ময়দানে। কখনো জিহাদের ময়দানে। কখনো মসজিদে নববীর মিম্বরে- উম্মতের উদ্দেশ্যে দরদমাখা ওয়াজ ও বয়ানে।
রমজানের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তের একটা অন্যতম মুহূর্ত হলো- সাহরী'র মুহূর্তটা। আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহরীকে বরকতময় খানা হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন-
تسحروا فان في السحور بركة
'সবাই মিলে সাহরী খাও, সাহরীতে আছে অনেক বরকত।'
সাহরী'র সময়টা হলো রাতের তৃতীয় প্রহর। বড়ো মুবারক সময়। আল্লাহ তখন চলে আসেন বান্দাদের অনেক কাছে। নেমে আসেন একেবারে প্রথম আকাশে। তখন তাওবা কবুল হয়। পাপ মোচন হয়। দু'আ কবুল হয়। মু'মিনের আধ্যাত্মিকতার রূপালী আকাশে নতুন নতুন তারকা উদিত হয়, দীপ্তি ছড়ায়! এ সময়টাতে বান্দার অশ্রুকাতর মুনাজাতে আল্লাহ সাড়া দেন, তাকে ক্ষমা করে দেন। তাঁর 'গাফফারিয়াত'-এর সাগরে তখন তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। আল্লাহ্‌ওয়ালাদের কাছে এই শেষ রজনী'র কদর তাই এতো বেশী!
وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ :
'রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতো।'
وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
'ঊষাকালে তারা ক্ষমাপ্রার্থী।'
সাহরী খেলে দিবসে ক্লান্তি অনুভব হয় না। দিবসের ইবাদত-বন্দেগিতে জোর পাওয়া যায়। রমজানে স্বল্পাহারে ও অপরিমিত খাদ্য গ্রহণে, সাহরী না খেয়ে কিংবা কম খেয়ে রোযা রাখায় ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ নেই। নবীজী উম্মতকে আরেকটি ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন কথায় এবং কাজে। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, সূর্যাস্তের পর যেনো কোনোক্রমেই ইফতারে দেরী করা না হয়। ইফতারের আগে দু'আ করার গুরুত্ব আছে। কিন্তু সে দু'আ প্রলম্বিত হতে হতে যেনো সূর্যাস্তের পর অনেক সময় গড়িয়ে না যায়।
ইফতারে আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় বস্তু ছিলো খেজুর এবং পানি। সারাদিন অভুক্ত ও পিপাসার্ত থাকার পর এই খেজুর এবং পানি-ই সবচে' উপযোগী খাদ্য।
হ্যাঁ, ইফতারের সময় আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু'আর ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন-
إن للصائم عند فطره دعوة ما ترد
'রোজাদারের জন্যে ইফতারের সময় রয়েছে এমন দু'আ যা ফিরিয়ে দেয়া হয় না।'
অনেকে মাগরিব আদায় করে ইফতার করতে বসে। এটি কিন্তু সুন্নতের খেলাফ। নবীজী মাগরিবের নামাজের আগেই ইফতার করতেন।
রমজানে সফরে বের হলে কোনটি উত্তম? রোযা ভাঙা না রাখা? আল্লাহ্‌র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু'টোই করেছেন। কখনো ভেঙেছেন আবার কখনো রেখেছেন। সাহাবায়ে কেরামকেও তিনি ভাঙা এবং রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। বদরে ইসলামের যে ঐতিহাসিক বিজয় সূচিত হয়েছিলো তা ছিলো এই রমজানেই। তিরমিযী এবং মুসনাদে আহমাদে হযরত উমর রা. বর্নিত হাদীসে এসেছে যে, আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের সময় পরিচালিত দু'টি গাযওয়ায় (যুদ্ধে) রোযা ভেঙেছেন।
রমজানের শেষ দশদিন আল্লাহ্‌র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ই'তিকাফ করতেন। উদ্দেশ্য ছিলো-
রমজানের গনিমতের পুরাপুরি কদর করা।
আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্ককে আরো গভীর ও নিবিড় করা।
দুনিয়ার যাবতীয় জুট-ঝামেলা থেকে ফারেগ হয়ে-
শবে কদরের তালাশে আত্মসমাহিত হওয়া।
হৃদয়কে নিয়ে আধ্যাত্মিকতার দিগন্তহীন আকাশে উড়ে বেড়ানো।
সৃষ্টি থেকে আলাদা হয়ে স্রষ্টার মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়া।
দু'আয় মুনাজাতে ফিসফিস অশ্রুকাতর আবেদনে-
রহমানের আরশে দোল ওঠানো।
৯৯ নামের ঝলকের ব্যাপকত্বে ঝলকিত হয়ে ওঠা।
মসজিদের নির্জন কোণকেই আবাস বানিয়ে-
কুরআন তিলাওয়াতের মহা সমুদ্রে ডুব দিয়ে কুড়িয়ে আনা-
মণি-মুক্তা-জহরত-
তাকওয়া ও আল্লাহভীতির,
সবর ও ধৈর্যের,
নৈতিকতা ও সুকুমারবৃত্তির।
কখনো কখনো স্রষ্টার সৃষ্টি রহস্যের অনুসন্ধানে চিন্তা-বিলীন হয়ে যাওয়া। তারাদের ঐ আকাশে,
নদী-সমুদ্রের এই স্রোতে কল্লোলে-
তাঁরই কুদরতের কারিশমা তালাশ করা।
ই'তিকাফের নীরব সাধনা-গৃহে বসে ভাবতে শেখা-
কতো আলো দেখেছি আমি-
এমন নূর তো দেখি নি কখনো!
কতো পুণ্যকর্মের ছায়ায় বসেছি আমি-
এমন শীতল ছায়ায় তো বসি নি কোনোদিন!
জেনেছি কতো! দেখেওছি কতো!
কিন্তু এমন করে তো জানি নি! এমনভাবে তো দেখি নি!
কেউ যদি বলে ই'তিকাফ কেনো?
তাকে বলবো- ইতিকাফ হলো-
ভালো জ্ঞানী হওয়ার জন্যে!
ভালো 'আবিদ' হওয়ার জন্যে!
ভালো 'আরিফ বিল্লাহ' হওয়ার জন্যে!
ভালো যিকিরকারী হওয়ার জন্যে!
ভালো সাধক হওয়ার জন্যে!
সবচে' বড় দুনিয়া-বিরাগ হওয়ার জন্যে!
সবচে' বড় আল্লাহ-নির্ভর হওয়ার জন্যে!
সবচে' বড় ধৈর্যশীল হওয়ার জন্যে!
আল্লাহ্‌র জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারে-
সেই শ্রেষ্ঠ মানুষটি হওয়ার জন্যে।
এক রাতেই হাজার মাসের ইবাদতে ধন্য-
সেই ঈর্ষণীয় মানুষটি হওয়ার জন্যে!
এতো অর্জন যে ইতিকাফে, বসে দেখেছো কখনো সেখানে-
সত্যিই কেমন হয় তোমার অন্তরের ভাব অনুভব?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন