আজ গোটা বিশ্বে যেভাবে নাস্তিকতা, আশ্লীলতা, বেহায়াপনা পথভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতা জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা খুবই আশঙ্কাজনক। সাদাসিধা সরলমনা মানুষদেরকে তাদের অসচেতনতায় ইসলামী শিক্ষা ও সরলপথ থেকে বিচ্যুত করা হচ্ছে। সম্মোহিত ও বিমোহিত করা হচ্ছে বাহ্য চাকচিক্য দিয়ে। প্রভাবিত করা হচ্ছে প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে। প্রতারিত করা হচ্ছে গলতকে সঠিক বলে, বিষকে প্রতিষেধক বলে। এক কথায় সরলমনা মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করতে সব ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে, ফলে তারা আত্মভোলা ও সরলমনা হওয়ায় বাহ্য চাকচিক্য মনোমুগ্ধকর হৃদয়গ্রাহী সৌন্দর্য্য ও আরাম আয়েশ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নির্দ্বিদায় এসব বিষয়েই প্রতিষেধক হিসেবে গ্রহণ করছে। গলতকেই সঠিক বলে গলধকরণ করছে। আজ তাদের প্রতিটি কদম, প্রতিটি পদক্ষেপ ধ্বংসাত্মক পথের দিকেই এগুচ্ছে। এখন আমরা যে দিকে দৃষ্টি ফিরাব সেদিকেই দেখব শয়তানের পথভ্রষ্ট বিভিন্ন বাহিনী সর্বত্র তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে রেখেছে। মুসলমানদেরকে তাদের আকিদা বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করতে এবং ঈমানের সাথে তাদের যে সেতুবন্ধন তা দূর্বল ও ছিন্ন করতে, তারা তাদের সর্বাত্মক চেষ্টা ব্যয় করছে। নাস্তিকতা, অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার এ ব্যাপক পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে, শয়তান মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার যে অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল- শয়তান বলেছিল- হে আল্লাহ! তুমি যেমন আমাকে বিপথে যেতে দিয়েছ, আমিও তেমনি ওতপেতে বসে থাকব যাতে করে তোমার নেক বান্দাদের গোমরাহ করতে পারি। [সূরা আরাফ : ১৬] তা পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করতে তার সহযোগী হিসেবে বেছে নিয়েছে তাদের কিছু দলকে। এ ব্যাপারে অবিরাম সে তাদেরকে উৎসাহিত ও উত্তেজিত করছে।
ইসলামের শত্রুদের সর্বক্ষণিক চেষ্টা প্রচেষ্টা দৌঁড়-ঝাপ ও উঠা বসা থেকে শুরু করে তাদের সকল কর্মকা-ের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের ঈমান নামক মূল্যবান সম্পদটা ছিনিয়ে নেয়া। যেন তারা চিরতরে বঞ্চিত হয়ে যায় এ মহান দৌলত থেকে, যে দৌলতের বলে বলিয়ান হয়েই সব রকমের কাজ করতে পারে মুসলমানরা। ধরে রাখতে পারে তাদের ইজ্জত আব্রু। ফিরিয়ে আনতে পারে তাদের হারানো ঐতিহ্য। তারা পুণরুজ্জীবিত করতে পারে সাহাবায়ে কেরাম ও আম্বিয়া কেরামের স্মরণীয় স্মৃতি। তারা আরো জানে কিভাবে ঈমানী শাক্তিতে বলিয়ান হয়ে, ক্ষমতার বাগডোর হাতে নিয়ে, জাহির পূজারী নফছ ও প্রবৃত্তির অনুসারী এবং ঈমান নামক মহান দৌলত থেকে বঞ্চিতদের লাগাম পড়াতে হয়। যার উজ্জল দৃষ্টান্ত সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তি আকাবির আসলাফের সোনালি ইতিহাস আজ সর্বত্র। বিশেষত গ্রাম গঞ্জে বিভিন্ন সম্প্রদায় কোমর বেঁেধ নেমেছে। সরলমনা মুসলমানদের অভাব অনটন দরিদ্রতা ও দূরবস্থাসহ জীবনে যত সমস্যা হয় তা সমাধান এবং তাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের নামে তারা তাদের কাছে ভিরছে এবং তাদের থেকে ঈমানের মত মহান দৌলতকে ছিনিয়ে নিচ্ছি। একীন এর মত মূল্যবান সম্পদ থেকে বঞ্চিত করছে।
অমুসলিমরা ইসলামী জীবন যাপন রীতিনীতি কৃষ্টিকালচারসহ ইসলামের শক্তি সামর্থ প্রতিপত্তি এবং ইসলামের বিজয়কে এতটা ভয় পায় যে, তা দমন করতে তারা মুসলমানদের মাঝে তাদের বিকৃত কিতাব চরমভাবে প্রচার প্রসার করছে। সর্বস্তরে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা তীব্রগতীতে ছড়িয়ে তার ভয়াবহ কুফল দিয়ে পুরো দুনিয়া ধ্বংস করার পায়তারা চালাচ্ছে। অশ্লীল ছবি ও মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলামানদের মানসিকতাকে পশ্চিমা সভ্যতা সংস্কৃতির রঙে রাঙিয়ে তুলছে। তারা খেলাধূলা নাচ গানের মতো বস্তুকে আকর্ষণীয় ও জাদুময় দুনিয়ার সাময়িক তুচ্ছ মজায় লিপ্ত রেখে, আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখ স্বাচ্ছন্দ ও অনন্তকালের জীবন থেকে উদাসিন করে রেখেছে। পশুত্ব ও প্রবৃত্তির হাতে আবদ্ধ করে জলন্ত অঙ্গারের মালা গলায় পড়িয়ে দিচ্ছে। দাওয়াতের কাজ ব্যপক হারে না থাকার কারণে বর্তমান সময়ে গ্রামের পর গ্রাম, বসতির পর বসতি অমুসলিমদের ফাঁদে পড়ে ঈমান ও ইসলাম থেকে বিমুখ হতে শুরু করেছে। তাদের চার্চ উপাসনালয়ে উপস্থিত হলেই কিংবা তাদের ধর্ম কবুল করলেই বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় পুরুষ্কার প্রদানের ওয়াদা দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন: ঘর বাড়ি দোকান পাট ব্যবসা বাণিজ্য এবং চিকিৎসা থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেয়া হচ্ছে। এসব শুনে ধোঁকায় পড়ে লোকজন ব্যাপকভাবে তাদের ধর্ম গ্রহণ করছে।
বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আশপাশের পরিবেশের প্রতি দৃষ্টি দিন, আমাদের রাত দিনের দৌড় ঝাপ ও সমস্ত কর্মকা-ের সারবস্তু হল, এক বিঘত পেটের চাহিদা পূরণ করা। যদি এর জন্য ইসলাম ও মানবীয় সীমারেখা লাফ দিয়ে অতিক্রম করতে হয় বা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধি বিধানের বিরোধিতা করতে হয় কিংবা তার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি ডেকে আনতে হয়, এমনকি তার জন্য নামায রোযা ও যাকাতেরমত শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিধিবিধানাবলী ছুটে গেলেও কোন যায় আসে না; কিন্তু ঠিক রাখতে হবে পাকস্থলীর পূঁজা। বাদ দেয়া যাবেনা তার কোন ধরনের চাহিদা।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সুসম্পর্ক স্থাপন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলেমগণ যেহেতু নবীদের উত্তরসূরি। হাদীসে উল্লেখ হয়েছে- ‘উলামাগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ কোন সম্পদের উত্তরাধিকারী রেখে যান না’ বরং তারা ইলম রেখে যান। [সহীহ ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ, দারামী] আর নবীদের পর নবীওয়ালা কাজ তথা উম্মতের সংশোধন তাদেরই যিম্মায়। তাই নাস্তিকতা ও ধর্ম ত্যাগের এ যুগে আলেমদের জন্য সাধারণের সাথে মিশতে হবে। তাদের ঘরে ঘরে যেতে হবে এবং তাদের সাথে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের অন্তরে ঈমান আমলের গুরুত্ব ও মর্যাদার অনুভুতি জন্মাতে হবে। আল্লাহ তাআলার বিধিনাবলী থেকে বিমুখতাপূর্ণ জীবন যাপনের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। এ দুনিয়ার যিন্দেগীর তুচ্ছতা এবং আখেরাতের চিরস্থায়ী যিন্দেগীর ও সেখানকার প্রকৃত আরাম আয়েশের কথা বলতে হবে। ঈমান ও ইসলামী যিন্দেগীতে অভ্যস্ত করতে হবে। যদি এ পথে কিছু কথাও শুনতে হয় তবুও সওয়াবের আশাবাদি হয়ে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করে যেতে হবে। এমনকি এক্ষেত্রে যদি লোকদের তোষামোদও করতে হয় তাতেও পিছু হটা যবেনা। এবং ইতস্তও করা যাবেনা। কেননা এসব তো নবীওয়ালা কাজ। তাছাড়াও নবীর উত্তরসূরি হওয়ার এটাও একটা দাবি যে, জনসাধারণের ভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতা আলেমদেরকে ব্যাকুল ও অস্থির করে তুলবে। সে সময় পর্যন্ত স্বস্তি ও প্রশান্তির শ্বাস নিতে পারবেনা, যাবৎ না উম্মতকে বাঁচানোর সম্ভাব্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
আলেম সমাজ ও জনসাধারণের দৃষ্টান্ত হচ্ছে নবী ও উম্মতের মতো। নবী সা. মানুষের বিপথগামিতা ও কুফুরির উপর অবিচলতা থেকে বাচাঁতে এবং ভয়াবহ পরিণতি থেকে মুক্তি দিতে তার যে দরদপূর্ণ চেষ্টা প্রচেষ্টা ছিল তার উদাহরণ সামনের একটি হাদীসে ফুটে উঠবে। হযরত জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যিনি আগুন জালালো সেখানে কীট পতঙ্গ ফড়িং ইত্যাদি এসে পড়তে থাকে আর সে এগুলোকে আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে থাকে। আমিও তোমাদের কোমর ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচাঁতে চেষ্টা করি। কিন্তু তোমরা আমার হাত থেকে বের হয়ে জাহান্নামে পড়ে যাও। [মুসলিম হা. ২২৮৫]।
আলেমগণ যারা নবুওয়াতের ধারক বাহক তাদেরও উচিৎ, জনসাধারণ ইসলামী যে কোন শিক্ষা থেকে বিমুখ হলেই এমন দরদ নিয়ে তাদের কে ধ্বংস থেকে বাচাঁনো। যেমন- কোন অন্ধ ব্যক্তি আমাদের চোখের সামনে পড়ে যেতে লাগলে মনুষত্ব আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই দেঁৗঁড়ে এসে তাকে রক্ষা করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে, তেমনি কোন মানুষ আখেরাত ভুলে গিয়ে দুনিয়ায় নিমগ্ন হয়ে জাহান্নামের অতলগহ্বরে পড়ে যেতে থাকলে আমাদের আলেম সমাজেরও উচিৎ তাদের কে বাচাঁনোর চেষ্টা করা।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হচ্ছে, আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সম্পর্কহীনতা। একে অপরের থেকে দূরে থাকা যা মূলত এ জাতির জন্য বড় দূর্ভাগ্য এবং ভবিষ্যৎ ইসলামের জন্য মারাত্মক আশংকাজনক এবং ধর্মহীনতা ও ধর্ম ত্যাগের মূল কারণ। তাই এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে যে দূরুত্ব ও সম্পর্কহীনতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করা। পূণরায় তাদের মাঝে সুসম্পর্ক ও বন্ধন সৃষ্টি করা। পরস্পরকে সহযোগিতা করা। এক সাথে মিলে মিশে কাজ করা। একে অপরের সম্মান ও মর্যাদা দেয়া।
আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সুসম্পর্কের সেতু বন্ধন তৈরি হওয়া প্রসঙ্গে একজন আল্লাহওয়ালা বলেছেন, আলেমদের সাথে জনসাধারণের সুসম্পর্ক হলেই এজাতি টিকে থাকবে। আলেমরা হবেন তাদের পরিচালক। যদি পরিচালক না থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ উ™£ান্ত হয়ে দিকবিদিক ঘুরতে থাকবে। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তারা কখনো তাদের মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছতে পারবেনা।
হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. ধর্মদ্রোহিতা মূর্খতা ও পরকাল ভোলার ব্যাপারে আলেমদের দায়িত্ব কর্তব্য ও তাদের ধর্মক্ষেত্র ও কর্মপদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন- চিন্তাশীলগণ জানেন, বর্তমানে ধর্মদ্রোহিতার ভয়াল থাবা থেকে মানুষকে বাচাঁনোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জন সাধারণের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন। তাদেরকে নিজস্ব নীতিতে শিক্ষা প্রদান। তাছাড়াও তাদের আছে কর্মোদ্যমী দায়িত্ব। কঠোর পরিশ্রমী এবং নিজেকে বিসর্জন দিয়ে অন্যকে প্রাধান্য দিতে জানা। নিজের উদ্দেশ্য সাধনে সব রকমের কষ্টই সহ্য করতে হবে আলেমদের। এসব বিষয়ই অসুস্থ স্বভাবীদের চম্বুকের মতো আকর্ষণ করে।
ধর্মদ্রোহী এ আন্দোলনের মোকাবেলায় শুধু চিন্তাগত দর্শন লেখালেখি ও দাওয়াত যথেষ্ট নয়; বরং সাথে সাথে জনসাধারণকে সম্বোধন করে তাদেরকে কাজে লাগানেরার মতো কিছু করতে হবে। জনসাধারণের সাথে সুস¤পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের কোন একটা স্তরকেও অবজ্ঞা করা যাবেনা। চাই সেটা গরীবের ছাপড়া হোক বা কৃষকের গোলা হোক। যেতে হবে তাদের ধর্মক্ষেত্রে, বৈঠকে এরপর বলতে হবে একান্ত কথা সেখানে গিয়ে। তাদের মাঝে কাজ করতে গিয়ে উদ্যম সহনশীলতা দৃঢ়তা ও পরিশ্রমে ওদের কর্মীদের চেয়ে কোন অংশে কম হওয়া যাবেনা। আর কল্যাণকামিতা হৃদ্যতা সৌহার্দ্য ও সমবেদনা তাদের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে হবে। কেননা তারা তো চায় নিছক তাদের অর্থনৈতিক দূরবস্থা সচ্ছল করতে এবং বাহ্য সমস্যার সমাধান করতে। তাদের ধর্মীয়, চারিত্রিক ও অধ্যাত্মিক অবস্থা এবং তাদের মন মানসিকতা উচুঁ করতে বিন্দুমাত্রও ভাবনা নেই। তাদের উদ্দেশ্যগত এ পার্থক্য সামনে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে।
হযরত নদভী রহ. এর এ মনমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্রাহী লেখাতে আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সুসম্পর্কের গুরুত্ব ধর্মহীন পরিবেশ পরিবর্তন এবং তা ইসলামী শিক্ষা দিয়ে অনুকূল পরিবেশে রুপান্তরকরণ সহ দাওয়াতের ও ইসলাহের পথে অধিক পরিমাণে মেহনত এবং নিজেকে কুরবান করার অনূভূতি জাগ্রত হয়। এবং এবিষয়টিও ফুটে উঠে, আজ ধর্মহীনদের আন্দোলন যে দ্রুতগতিতে ও শক্তি সামর্থ নিয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে এবং যে ব্যাপক রুপ ধারন করছে তা প্রতিহত করতে পারে একমাত্র আলেম সমাজ। কিন্তু প্রয়োজন হবে ব্যাপকভাবে দাওয়াত ও সর্বব্যাপী শিক্ষাদিক্ষা দেয়ার মানসিকতা তৈরি করা। জনসাধারণের সাথে মিশে তাদের সমস্যাবলী জেনে যথাসম্ভব সমাধানের চেষ্টা করা। সরাসরি তাদের মাঝে থেকে সুসম্পর্ক স্থাপন করত বিদেশি চক্রান্ত থেকে তাদের কে হেফাজত করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।
ইসলামের শত্রুদের সর্বক্ষণিক চেষ্টা প্রচেষ্টা দৌঁড়-ঝাপ ও উঠা বসা থেকে শুরু করে তাদের সকল কর্মকা-ের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদের ঈমান নামক মূল্যবান সম্পদটা ছিনিয়ে নেয়া। যেন তারা চিরতরে বঞ্চিত হয়ে যায় এ মহান দৌলত থেকে, যে দৌলতের বলে বলিয়ান হয়েই সব রকমের কাজ করতে পারে মুসলমানরা। ধরে রাখতে পারে তাদের ইজ্জত আব্রু। ফিরিয়ে আনতে পারে তাদের হারানো ঐতিহ্য। তারা পুণরুজ্জীবিত করতে পারে সাহাবায়ে কেরাম ও আম্বিয়া কেরামের স্মরণীয় স্মৃতি। তারা আরো জানে কিভাবে ঈমানী শাক্তিতে বলিয়ান হয়ে, ক্ষমতার বাগডোর হাতে নিয়ে, জাহির পূজারী নফছ ও প্রবৃত্তির অনুসারী এবং ঈমান নামক মহান দৌলত থেকে বঞ্চিতদের লাগাম পড়াতে হয়। যার উজ্জল দৃষ্টান্ত সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তি আকাবির আসলাফের সোনালি ইতিহাস আজ সর্বত্র। বিশেষত গ্রাম গঞ্জে বিভিন্ন সম্প্রদায় কোমর বেঁেধ নেমেছে। সরলমনা মুসলমানদের অভাব অনটন দরিদ্রতা ও দূরবস্থাসহ জীবনে যত সমস্যা হয় তা সমাধান এবং তাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের নামে তারা তাদের কাছে ভিরছে এবং তাদের থেকে ঈমানের মত মহান দৌলতকে ছিনিয়ে নিচ্ছি। একীন এর মত মূল্যবান সম্পদ থেকে বঞ্চিত করছে।
অমুসলিমরা ইসলামী জীবন যাপন রীতিনীতি কৃষ্টিকালচারসহ ইসলামের শক্তি সামর্থ প্রতিপত্তি এবং ইসলামের বিজয়কে এতটা ভয় পায় যে, তা দমন করতে তারা মুসলমানদের মাঝে তাদের বিকৃত কিতাব চরমভাবে প্রচার প্রসার করছে। সর্বস্তরে উলঙ্গপনা ও বেহায়াপনা তীব্রগতীতে ছড়িয়ে তার ভয়াবহ কুফল দিয়ে পুরো দুনিয়া ধ্বংস করার পায়তারা চালাচ্ছে। অশ্লীল ছবি ও মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলামানদের মানসিকতাকে পশ্চিমা সভ্যতা সংস্কৃতির রঙে রাঙিয়ে তুলছে। তারা খেলাধূলা নাচ গানের মতো বস্তুকে আকর্ষণীয় ও জাদুময় দুনিয়ার সাময়িক তুচ্ছ মজায় লিপ্ত রেখে, আখেরাতের চিরস্থায়ী সুখ স্বাচ্ছন্দ ও অনন্তকালের জীবন থেকে উদাসিন করে রেখেছে। পশুত্ব ও প্রবৃত্তির হাতে আবদ্ধ করে জলন্ত অঙ্গারের মালা গলায় পড়িয়ে দিচ্ছে। দাওয়াতের কাজ ব্যপক হারে না থাকার কারণে বর্তমান সময়ে গ্রামের পর গ্রাম, বসতির পর বসতি অমুসলিমদের ফাঁদে পড়ে ঈমান ও ইসলাম থেকে বিমুখ হতে শুরু করেছে। তাদের চার্চ উপাসনালয়ে উপস্থিত হলেই কিংবা তাদের ধর্ম কবুল করলেই বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় পুরুষ্কার প্রদানের ওয়াদা দেয়া হচ্ছে। সেই সাথে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন: ঘর বাড়ি দোকান পাট ব্যবসা বাণিজ্য এবং চিকিৎসা থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেয়া হচ্ছে। এসব শুনে ধোঁকায় পড়ে লোকজন ব্যাপকভাবে তাদের ধর্ম গ্রহণ করছে।
বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আশপাশের পরিবেশের প্রতি দৃষ্টি দিন, আমাদের রাত দিনের দৌড় ঝাপ ও সমস্ত কর্মকা-ের সারবস্তু হল, এক বিঘত পেটের চাহিদা পূরণ করা। যদি এর জন্য ইসলাম ও মানবীয় সীমারেখা লাফ দিয়ে অতিক্রম করতে হয় বা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিধি বিধানের বিরোধিতা করতে হয় কিংবা তার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টি ডেকে আনতে হয়, এমনকি তার জন্য নামায রোযা ও যাকাতেরমত শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিধিবিধানাবলী ছুটে গেলেও কোন যায় আসে না; কিন্তু ঠিক রাখতে হবে পাকস্থলীর পূঁজা। বাদ দেয়া যাবেনা তার কোন ধরনের চাহিদা।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সুসম্পর্ক স্থাপন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আলেমগণ যেহেতু নবীদের উত্তরসূরি। হাদীসে উল্লেখ হয়েছে- ‘উলামাগণ নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ কোন সম্পদের উত্তরাধিকারী রেখে যান না’ বরং তারা ইলম রেখে যান। [সহীহ ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ, দারামী] আর নবীদের পর নবীওয়ালা কাজ তথা উম্মতের সংশোধন তাদেরই যিম্মায়। তাই নাস্তিকতা ও ধর্ম ত্যাগের এ যুগে আলেমদের জন্য সাধারণের সাথে মিশতে হবে। তাদের ঘরে ঘরে যেতে হবে এবং তাদের সাথে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের অন্তরে ঈমান আমলের গুরুত্ব ও মর্যাদার অনুভুতি জন্মাতে হবে। আল্লাহ তাআলার বিধিনাবলী থেকে বিমুখতাপূর্ণ জীবন যাপনের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। এ দুনিয়ার যিন্দেগীর তুচ্ছতা এবং আখেরাতের চিরস্থায়ী যিন্দেগীর ও সেখানকার প্রকৃত আরাম আয়েশের কথা বলতে হবে। ঈমান ও ইসলামী যিন্দেগীতে অভ্যস্ত করতে হবে। যদি এ পথে কিছু কথাও শুনতে হয় তবুও সওয়াবের আশাবাদি হয়ে ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে কাজ করে যেতে হবে। এমনকি এক্ষেত্রে যদি লোকদের তোষামোদও করতে হয় তাতেও পিছু হটা যবেনা। এবং ইতস্তও করা যাবেনা। কেননা এসব তো নবীওয়ালা কাজ। তাছাড়াও নবীর উত্তরসূরি হওয়ার এটাও একটা দাবি যে, জনসাধারণের ভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতা আলেমদেরকে ব্যাকুল ও অস্থির করে তুলবে। সে সময় পর্যন্ত স্বস্তি ও প্রশান্তির শ্বাস নিতে পারবেনা, যাবৎ না উম্মতকে বাঁচানোর সম্ভাব্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
আলেম সমাজ ও জনসাধারণের দৃষ্টান্ত হচ্ছে নবী ও উম্মতের মতো। নবী সা. মানুষের বিপথগামিতা ও কুফুরির উপর অবিচলতা থেকে বাচাঁতে এবং ভয়াবহ পরিণতি থেকে মুক্তি দিতে তার যে দরদপূর্ণ চেষ্টা প্রচেষ্টা ছিল তার উদাহরণ সামনের একটি হাদীসে ফুটে উঠবে। হযরত জাবের রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, আমার ও তোমাদের দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যিনি আগুন জালালো সেখানে কীট পতঙ্গ ফড়িং ইত্যাদি এসে পড়তে থাকে আর সে এগুলোকে আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে থাকে। আমিও তোমাদের কোমর ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচাঁতে চেষ্টা করি। কিন্তু তোমরা আমার হাত থেকে বের হয়ে জাহান্নামে পড়ে যাও। [মুসলিম হা. ২২৮৫]।
আলেমগণ যারা নবুওয়াতের ধারক বাহক তাদেরও উচিৎ, জনসাধারণ ইসলামী যে কোন শিক্ষা থেকে বিমুখ হলেই এমন দরদ নিয়ে তাদের কে ধ্বংস থেকে বাচাঁনো। যেমন- কোন অন্ধ ব্যক্তি আমাদের চোখের সামনে পড়ে যেতে লাগলে মনুষত্ব আছে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিই দেঁৗঁড়ে এসে তাকে রক্ষা করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে, তেমনি কোন মানুষ আখেরাত ভুলে গিয়ে দুনিয়ায় নিমগ্ন হয়ে জাহান্নামের অতলগহ্বরে পড়ে যেতে থাকলে আমাদের আলেম সমাজেরও উচিৎ তাদের কে বাচাঁনোর চেষ্টা করা।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হচ্ছে, আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সম্পর্কহীনতা। একে অপরের থেকে দূরে থাকা যা মূলত এ জাতির জন্য বড় দূর্ভাগ্য এবং ভবিষ্যৎ ইসলামের জন্য মারাত্মক আশংকাজনক এবং ধর্মহীনতা ও ধর্ম ত্যাগের মূল কারণ। তাই এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে যে দূরুত্ব ও সম্পর্কহীনতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করা। পূণরায় তাদের মাঝে সুসম্পর্ক ও বন্ধন সৃষ্টি করা। পরস্পরকে সহযোগিতা করা। এক সাথে মিলে মিশে কাজ করা। একে অপরের সম্মান ও মর্যাদা দেয়া।
আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সুসম্পর্কের সেতু বন্ধন তৈরি হওয়া প্রসঙ্গে একজন আল্লাহওয়ালা বলেছেন, আলেমদের সাথে জনসাধারণের সুসম্পর্ক হলেই এজাতি টিকে থাকবে। আলেমরা হবেন তাদের পরিচালক। যদি পরিচালক না থাকে তাহলে সাধারণ মানুষ উ™£ান্ত হয়ে দিকবিদিক ঘুরতে থাকবে। সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে তারা কখনো তাদের মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছতে পারবেনা।
হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. ধর্মদ্রোহিতা মূর্খতা ও পরকাল ভোলার ব্যাপারে আলেমদের দায়িত্ব কর্তব্য ও তাদের ধর্মক্ষেত্র ও কর্মপদ্ধতি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেন- চিন্তাশীলগণ জানেন, বর্তমানে ধর্মদ্রোহিতার ভয়াল থাবা থেকে মানুষকে বাচাঁনোর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জন সাধারণের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন। তাদেরকে নিজস্ব নীতিতে শিক্ষা প্রদান। তাছাড়াও তাদের আছে কর্মোদ্যমী দায়িত্ব। কঠোর পরিশ্রমী এবং নিজেকে বিসর্জন দিয়ে অন্যকে প্রাধান্য দিতে জানা। নিজের উদ্দেশ্য সাধনে সব রকমের কষ্টই সহ্য করতে হবে আলেমদের। এসব বিষয়ই অসুস্থ স্বভাবীদের চম্বুকের মতো আকর্ষণ করে।
ধর্মদ্রোহী এ আন্দোলনের মোকাবেলায় শুধু চিন্তাগত দর্শন লেখালেখি ও দাওয়াত যথেষ্ট নয়; বরং সাথে সাথে জনসাধারণকে সম্বোধন করে তাদেরকে কাজে লাগানেরার মতো কিছু করতে হবে। জনসাধারণের সাথে সুস¤পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তাদের কোন একটা স্তরকেও অবজ্ঞা করা যাবেনা। চাই সেটা গরীবের ছাপড়া হোক বা কৃষকের গোলা হোক। যেতে হবে তাদের ধর্মক্ষেত্রে, বৈঠকে এরপর বলতে হবে একান্ত কথা সেখানে গিয়ে। তাদের মাঝে কাজ করতে গিয়ে উদ্যম সহনশীলতা দৃঢ়তা ও পরিশ্রমে ওদের কর্মীদের চেয়ে কোন অংশে কম হওয়া যাবেনা। আর কল্যাণকামিতা হৃদ্যতা সৌহার্দ্য ও সমবেদনা তাদের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে হবে। কেননা তারা তো চায় নিছক তাদের অর্থনৈতিক দূরবস্থা সচ্ছল করতে এবং বাহ্য সমস্যার সমাধান করতে। তাদের ধর্মীয়, চারিত্রিক ও অধ্যাত্মিক অবস্থা এবং তাদের মন মানসিকতা উচুঁ করতে বিন্দুমাত্রও ভাবনা নেই। তাদের উদ্দেশ্যগত এ পার্থক্য সামনে নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে।
হযরত নদভী রহ. এর এ মনমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্রাহী লেখাতে আলেম সমাজ ও জনসাধারণের মাঝে সুসম্পর্কের গুরুত্ব ধর্মহীন পরিবেশ পরিবর্তন এবং তা ইসলামী শিক্ষা দিয়ে অনুকূল পরিবেশে রুপান্তরকরণ সহ দাওয়াতের ও ইসলাহের পথে অধিক পরিমাণে মেহনত এবং নিজেকে কুরবান করার অনূভূতি জাগ্রত হয়। এবং এবিষয়টিও ফুটে উঠে, আজ ধর্মহীনদের আন্দোলন যে দ্রুতগতিতে ও শক্তি সামর্থ নিয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে এবং যে ব্যাপক রুপ ধারন করছে তা প্রতিহত করতে পারে একমাত্র আলেম সমাজ। কিন্তু প্রয়োজন হবে ব্যাপকভাবে দাওয়াত ও সর্বব্যাপী শিক্ষাদিক্ষা দেয়ার মানসিকতা তৈরি করা। জনসাধারণের সাথে মিশে তাদের সমস্যাবলী জেনে যথাসম্ভব সমাধানের চেষ্টা করা। সরাসরি তাদের মাঝে থেকে সুসম্পর্ক স্থাপন করত বিদেশি চক্রান্ত থেকে তাদের কে হেফাজত করা। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন